
এবার আমরা দেখে নিতে পারি বঙ্কিমের ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসটিকে (১৮৬৯)। সেখানেও দেখা যায় বঙ্কিমের ধর্মীয় রাজ্য পুনরুদ্ধারের বাসনা। মুসলমান শক্তির কবলমুক্ত হয়ে স্বাধীন হিন্দু রাজ্য প্রতিষ্ঠা করার জন্য বঙ্কিমকে খুবই তাড়া করেছে, যা ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের প্রধান দিক। আর তাই দেখা যায় ‘ইখতিয়ার উদ্দিন বিন বখতিয়ার খিলজি’-র নবদ্বীপ বিজয়কে বঙ্কিম মোটেই মেনে নিতে পারেন নি। ‘মৃণালিনী’ উপন্যাসের মাধবাচার্যকে দিয়ে হেমচন্দ্রকে আশ্বাস দিয়েছেন এইভাবে-
‘‘বৎস! দুঃখিত হইও না। দৈব নির্দেশ কখনো বিফল হইবার নহে। আমি যখন গণনা করিয়াছি যে, যবন পরাভূত হইবে, তখন নিশ্চয় জানিও তাহারা পরাভূত হইবে। যবনেরা নবদ্বীপ অধিকার করিয়াছে বটে, কিন্তু নবদ্বীপ তো গৌড় নহে। প্রধান রাজা সিংহাসন ত্যাগ করিয়া পলায়ন করিয়াছেন। কিন্তু এই গৌড় রাজ্যে অনেক করপ্রদ রাজা আছেন, তাহারা তো এখনও বিজিত হয়েন নাই। কে জানে যে, সকল রাজা একত্র হইয়া প্রাণপন করিলে যবন বিজিত না হইবে’’?
(দ্রষ্টব্যঃ বঙ্কিম উপন্যাস সমগ্র, রিফ্লেক্ট পাব্লিকেশন, কলকাতা)
‘মৃণালিনী’ উপন্যাস প্রসঙ্গে সুপ্রিয় সেনের অভিমত খুবই প্রণিধানযোগ্য বলে মনে করি। তিনি তাঁর ‘উনবিংশ শতাব্দীর স্বদেশ চিন্তা ও বঙ্কিমচন্দ্র’ গ্রন্থে যথার্থভাবেই বলেছেন, ‘হিন্দুর স্বদেশপ্রীতি জাগ্রত করার জন্য বখতিয়ারকে মিথ্যাবাদী, কুচক্রী ও ভন্ড করে এঁকেছেন। এবং অন্তিম আশার সঞ্চার করেছেন, পশ্চিম দেশীয় বণিক কর্তৃক ‘যবন’ রাজত্বের অবসানের সম্ভাবনার কথা বলে। —– ‘এর সঙ্গে মুসলমান বিরোধী বীরত্বের এক হাস্যকর রুপায়ন আছে যখন হেমচন্দ্র নগর মধ্যে একা প্রচুর মুসলমান সৈন্যর সঙ্গে যুদ্ধ করে অবিজিত থাকেন’। সুপ্রিয় সেনের সঙ্গে এ ব্যাপারে শতাংশ পরিমাণ সহমত করেই বলতে হয়- হিন্দুরাজ্য পুনরুদ্ধার করার মানসিকতা নিয়ে হিন্দু মুসলমানদের সম্পর্ককে বঙ্কিম তিক্ত করার চেষ্টা করেছেন। আর ‘মৃণালিনী’ উপন্যাস তারই সূচনা।
এবার আসা যেতে পারে, ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের (১৮৮২) আলোচনায়। হিন্দুত্ব, হিন্দু জীবন, হিন্দু জাগরণ নিয়ে এক পক্ষপাতপূর্ণ বর্ণনা তো রয়েছ। মোগল জীবনধারা নিয়ে অনেক বিকৃতি। উপন্যাসের প্রথমখন্ডের দ্বিতীয় পরিচ্ছেদে রূপনগরের রাজকন্যা ‘চঞ্চল কুমারি’ ধীরে ধীরে অলঙ্কার শোভিত বাম চরণ খানি ঔরঙ্গজেবের চিত্রের উপরে সংস্থাপিত করিলেন—চিত্রের শোভা বুঝি বাড়িয়া গেল। ‘চঞ্চল কুমারি’ একটু হেলিলেন —মড় মড় শব্দ হইল — ঔরঙ্গজেব বাদশাহের প্রতিমূর্তি রাজপুত কুমারীর চরণতলে ভাঙিয়া গেল।
……………………………………….
রাজপুত কুমারী হাসিয়া বলিলেন, ‘যেমন ছেলেরা পুতুল খেলিয়া সংসারের সাধ মিটায়, আমি তেমনই মোগল বাদশাহের মুখে নাতি মারার সাধ মিটাইলাম’। তারপর নির্মলের মুখ চাহিয়া বলিলেন ‘সখি নির্মল? ছেলেদের সাধ মিটে; সময়ে তাহাদের সত্যের ঘর-সংসার হয়। আমার কি সাধ মিটেবেনা? আমি কখনও জীবন্ত ঔরঙ্গজেবের মুখে এইরুপ’- রাজসিংহ উপন্যাসের শেষ পরিচ্ছেদে দেখা যাচ্ছে দয়ার অনুকরণে হিন্দু সাম্রাজ্য পুনঃস্থাপিত করলেও কিন্তু রাজমন্ত্রী দয়াল শাহ সে প্রকৃতির লোক নহেন। তিনিও যুদ্ধে প্রবৃত্ত। মালবে মুসলমানের সর্বনাশ করিতে লাগিলেন। ঔরঙ্গজেব হিন্দুধর্মের উপর অনেক অত্যাচার করিয়াছিল। প্রতিশোধের স্বরুপে ইনি কাজিদিগের মস্তক মুণ্ডন করিয়া বাধিতে লাগিলেন। কোরান দেখিলেই কুয়ায় ফেলিয়া দিতে লাগিলেন।
এইভাবে ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের পরতে পরতে, ছত্রে-ছত্রে মুসলিম বিদ্বেষ মাত্রাতিরিক্ত স্থান করে নিয়েছে। আর উপন্যাসের উপসংহারে বঙ্কিম একরকম সাফাই দিয়ে বলেছেন, ‘কোনও পাঠক না মনে করেন যে, হিন্দু-মুসলমানের কোনও তারতম্য নির্দেশ করা এই গ্রন্থের উদ্দেশ্য’। এটা তো বঙ্কিম চন্দ্রের একধরণের জুতো মেরে গরু দান করারই সামিল। কলকাতার বিশিষ্ট কবি-সাহিত্যিক-লেখক-গবেষক, জাঁদরেল পুলিশ অফিসার (অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস) ডঃ নজরুল ইসলাম তাঁর ‘বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক’ গ্রন্থে যথার্থভাবেই বলেছেন ‘রামকৃষ্ণ’, বিবেকানন্দ এবং বঙ্কিমচন্দ্র এই মনোভাবকে (হিন্দুত্ব) আরও দৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করলেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের (১৮৩৬+৮৬) ‘যত মত তত পথ’ বানী প্রচারের মাধ্যমে মূর্তিপূজাকেও ঈশ্বর প্রাপ্তির উপায় হিসেবে স্বীকার করলেন। বেদান্তবাদী স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২) রামকৃষ্ণের বাণীকে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে দিলেন। ১৮৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১১ সেপ্টেম্বর শিকাগোর মহাধর্মসভায় বক্তৃতা করে তিনি হিন্দু ধর্মের মহিমা বৃদ্ধি করলেন। বঙ্কিমচন্দ্র পৌরানিক হিন্দুধর্ম এবং মূর্তিপূজাকে গ্রহনযোগ্য করার জন্য কলম ধরলেন। কৃষ্ণচরিত্র (১৮৮৬), ধর্মতত্ব (১৮৮৮), শ্রীমদ্ভগবতগীতা (১৯০২), দেবতত্ব ও হিন্দুধর্ম প্রভৃতি প্রবন্ধগ্রন্থে তিনি পৌরাণিক হিন্দু ধর্মকে তৎকালীন আধুনিক মনের কাছে গ্রহনযোগ্য করে উপস্থাপিত করেন। (দ্রষ্টব্য, বাংলায় হিন্দু মুসলমান সম্পর্ক, ডঃ নজরুল ইসলাম, পাতা – ১৬৭, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স, কলকাতা)।
কলকাতার জনপ্রিয় কথা সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বলেছেন, ‘সে দেশের অর্ধেক সংখ্যক মানুষকে দূরে সরিয়ে রেখে এ কোন ধরনের দেশপ্রেম’? দীনবন্ধু মিত্র ও মাইকেল মধুসূদন দত্ত দুজনেই মোটা দাগে বঙ্কিমচন্দ্রের সমকালীন লেখক। ‘নীলদর্পণে’ চেষ্টা করেছেন দীনবন্ধু হিন্দু মুসলমানকে এক জায়গায় মেলাতে, একটি প্রহসনে মাইকেলও তাই করেছেন, আর বঙ্কিম তার উপন্যাসগুলিতে অনবরত চেষ্টা চালিয়েছেন হিন্দু মুসলমানের বিরোধ সৃষ্টির। (দ্রষ্টব্য, কবিতার জন্য ও অন্যান্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্যাপিরাস, কলকাতা)। কবিতার জন্য ও ‘অন্যান্য’ গ্রন্থে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আরও স্পষ্ট ভাষণ ‘যে মানসিকতার ফলে ভারতবর্ষকে বাধ্য হয়ে বিভক্ত করা হল, তার উৎপত্তির অন্যতম প্রধান কারণ “আনন্দমঠের” মত উপন্যাস রচনা এবং এই উপন্যাসের লেখককে “স্বদেশী মন্ত্রে উদ্গাতা’’ হিসাবে গণ্য করা’।
তাই সংগত কারণেই বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক ও চিন্তাবিক আহমেদ ছফা ‘শতবর্ষের ফেরারিঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ নিবন্ধে যথার্থভাবেই বলেছেন ‘উনিশ শতকের হিন্দু মনীষীরা এই উপমহাদেশে প্রায় হাজার বছরের মুসলিম শাসনকে আতঙ্কিত দুঃস্বপ্ন জ্ঞান করে আলাদা করে রাখলেন’। আহমেদ ছফার এই যুক্তিসঙ্গত –তীক্ষ্ণ বক্তব্য বঙ্কিমের বিদ্বেষ ও বিভাজন স্বরূপকে নতুন করে চিনিয়ে দিচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের কাছে। তাই আহমেদ ছফার “শতবর্ষের ফেরারিঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’’ নিবন্ধটিকে বিরোধিতা করে যারা বঙ্কিমের সাফাই দিতে চান তারা কিন্তু প্রজন্মকে সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন করছেন। আবুল কাসেম ফজলুল হক-এর “আহমেদ ছফার বঙ্কিম বিচার” (নতুন এক মাত্রা, শরৎ সংখ্যা) নিবন্ধে বঙ্কিমের ‘যবন’ শব্দ ব্যভারটাকেও লঘু করে দেখা হয়েছে, তা কিন্তু যুক্তিসঙ্গত নয়। হক সাহেবের সঙ্গে সহমত পোষণ করেই বলছি ‘যবন’ শব্দের অর্থ বিদেশী। ধীরে ধীরে এই শব্দটি সংকুচিত হয়ে গালিতে পরিণত হয়ে গেছে। যে সময়টিতে বঙ্কিম মোগলদের ‘যবন’ বলছেন কিংবা বাংলার তুর্কিশাসক কিংবা নবাবদের ‘যবন’ বলছেন ততদিনে তারা ‘বিদেশী’ মোটেই ছিল না। তারা ততদিনে ভারত আত্মার সঙ্গে মিলে মিশে গেছেন। বরং আহমেদ শাহ আবদালি কিংবা নাদির শাহকে আমরা বিদেশী বলতে পারি। তারা এদেশের ধনসম্পদ লুঠ করে পারস্য নিয়ে গেছেন। মহম্মদ ঘোরী থেকে মোগল বাদশাহরা ভারতবর্ষকে গঠন করেছেন। ভারতবর্ষে মুসলিম শাসন কায়েম হয়েছিল বলেই নিম্নবর্গিয় হিন্দুরা তাদের মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছিল। আর ফজলুল সাহেব যদি আজও মুসলিম শাসকদের ‘যবন’ বা ‘বিদেশী’ হিসাবে ব্যাখা করেন তাহলে তা ভারতের বা পশ্চিমবঙ্গের বিজেপি, আরএসএস সহ হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির হাতে অস্ত্র হিসাবে তুলে দেবেন। আর- সেই অস্ত্র পেয়ে এরা ভারতের মসুলিম শাসক থেকে মুসলিম নাগরিকদের ‘বিদেশী’ বলার আরও সুযোগ পেয়ে যাবে। আহমেদ ছফা বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়দের বঙ্কিম অনুধাবন ছিল যথার্থই। ১৭৫৭ থেকে ১৮৫৭ সালের চোরাস্রোত মার্কা সাম্প্রদায়িকতা ও প্রচ্ছন্ন মার্কা হিন্দুত্ববাদ ১৮৫৭ সালে পরবর্তী বঙ্কিম থেকে ভায়া বিবেকানন্দ এবং শ্যামাপ্রসাদ পর্যন্ত খোলাখুলি হিন্দুত্ববাদ দেশবিভাজন পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলিকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৪৭ সালে ভারত ধর্মনিরপেক্ষ পথ নিলেও (অবশ্য ভারতের সংবিধানে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দটি লিখিতভাবে এসেছে ১৯৭৬ সালে) হিন্দুত্ববাদ জীবন্ত ছিল। জহরলাল, গান্ধীজী কিংবা আবুল কালাম আজাদের মতো ব্যক্তিত্বরা যথেষ্ট ধর্মনিরপেক্ষ ছিলেন। কিন্তু তার অভ্যন্তরে প্যটেলজিরা ছিলেন প্রো হিন্দুত্ববাদী, নাহলে ভারতে যত দাঙ্গা হয়েছে সবটাই কংগ্রেসের আমলে বেশি। আজ গুজরাট হচ্ছে বিজেপির আমলে একটি সফল গণহত্যা। পশ্চিমবঙ্গে ৫০-৬০-এর দশকে দাঙ্গা তো সবাইকেই বিশেষভাবে মুসলিমদের আতঙ্কিত করে। ১৯৬৪ সালের দাঙ্গা পশ্চিমবঙ্গের সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিপন্ন করেছে। তারা পালিয়ে গেছে পূর্ব পাকিস্তান অধুনা বাংলাদেশে। নেলি (আসাম), মুম্বাই, ভাগলপুর, সুরাট, মীরাট মুজাফফরনগর দাঙ্গা ভারতের সংখ্যালঘুদের আতঙ্ক করে তুলেছে। তাই বলা চলে বঙ্কিমের হিন্দুত্ববাদ ও হিন্দুজাগরণে প্রভাবিত রাজনৈতিক দলগুলি। কংগ্রেস নরম সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী, বিজেপি, আরএসএস ‘উগ্র সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী’ কমিউনিস্ট তথা বামপন্থীরা সুক্ষ সাম্প্রদায়িক ও হিন্দুত্ববাদী। আর সব রাজনৈতিক দলগুলি ব্রাহ্মন্যবাদের নিগড়ে বাঁধা। তা নাহলে ৩৪ বছর (১৯৭৭-২০১১) সিপিআই(এম) নেতৃত্বধীন বামফ্রন্ট সরকার পশ্চিমবাংলায় ক্ষমতায় থাকার পরও সংখ্যালঘু মুসলিমদের চাকুরির হার মাত্র সাড়ে তিন (৩.৫) শতাংশ, যে রাজ্যে ৩০ শতাংশের কাছাকাছি মুসলিমদের বসবাস। যদিও হিন্দুত্ববাদী আরএসএস বিজেপিকে বামফন্টের আমলে সেভাবে বাড়তে দেওয়া হয়নি। আলোচনার খাতিরে আমি একজন বামপন্থি হিসাবে একথা বলতে বাধ্য হচ্ছি, বাংলাদেশের কিছু বামপন্থী এজেন্ট মার্কা বুদ্ধিজীবী বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে কলকাতায় মায়া কান্না করতে এসে ভারতের মুসলিমদের কার্যত অস্বস্তিতে ফেলে। কেন এটি করা হবে? যে কোনও দেশে সংখ্যালঘু নির্যাতনকে আমি নিন্দা করি। যেদেশে এটি হবে সেই দেশেই মোকাবিলা করা দরকার।
আবার পূর্বপ্রসঙ্গে ফিরে যাই। উনবিংশ শতাব্দীর ৫০-এর দশক থেকে অবিভক্ত ভারতে বিশেষ করে বঙ্গের মাটিতে হিন্দুত্ববাদ হিন্দুজাগরণ মাথা চাড়া দিতে থাকল, তখন কিন্তু শিক্ষিত মুসলিম সহ মুসলিম সমাজ পরিচয় সঙ্কট, বিপন্নতা ও আতঙ্কে ভুগতে থাকেন। তাই বঙ্কিমের ঘনিষ্ঠ বন্ধু নবাব আব্দুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩) কলকাতার তালতলাতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘মহামেডান লিটারেরি সোসাইটি’ (২ এপ্রিল, ১৮৬৩)। তার আগে ওই তালতলায় ১৮৫৫ সালের ৬ মে কলকাতার মহম্মদ মাজহার স্থাপন করলেন ‘আঞ্জুমান ইসলামী’ বা ‘মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’। বঙ্গ তথা ভারতের মুসলমানদের এটিই প্রথম যৌথ প্রতিষ্ঠান। সৈয়দ আমির হোসেনের ওই তালতলা এলাকায় স্থাপিত হল ‘ন্যাশনাল মহামেডান অ্যাসোসিয়েশন।‘ মুসলিম স্বার্থ রক্ষাই ছিল এই প্রতিষ্ঠানগুলির উদ্দেশ্য।
এইসব প্রতিষ্ঠা গুলির কাজ থিতিয়ে পড়লে কলকাতার সমাজহিতৈষী মুসলিম যুবকরা গঠন করল ‘কলিকাতা মহামেডান ইউনিয়ন’। এটি গঠিত হয় ১৮৯৩ সালে। ১৮৯৬ সালে ব্যারিস্টার আব্দুর রহিম ও আইনজীবী মহম্মদ ইউসুফের যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয় ‘মহামেডান রিফর্ম অ্যাসোসিয়েশন’। কলকাতা মাদ্রাসা কলেজের (আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) ছাত্ররা প্রতিষ্ঠা করে ‘মাদ্রাসা লিটারেরি অ্যান্ড ডিবেটিং ক্লাব’ (১৮৭৫)। ঢাকা মাদ্রাসার সুপারিন্টেনডেন্ট উবাইদুল্লাহ আল উবাউদু সোহরাওয়ারদি গঠন করেন ‘সমাজ সম্মিলনী সভা ও ঢাকা মুসলমান সুহৃদ সম্মিলনী’ (১৮৮৩)। মুসলিমদের খেলাধুলা ও শারীরিক চর্চার জন্য গঠন করতে হয় ‘মহামেডান এল্গিন স্পোর্টিং ক্লাব’ (১৮৯৯)। আর সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চার জন্য স্থাপিত হয় ‘মুসলিম ইন্সটিটিউট’ (১৯০২)। কাকাবাবু মুজাফফর আহমেদকেও প্রতিষ্ঠা করতে হয় ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি’। তারপর তো স্যার সৈয়দ আহমেদ খাঁ-র আলিগড় মুভমেন্ট তো আছেই। আর সবার শেষে ১৯০৬ সালে ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ-র ‘মুসলীম লীগ’ প্রতিষ্ঠা একটি মসুলিম সংগঠন হিসেবে। অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বিভাজন। পাকিস্তান। ভারত-ভাগ। ভারতীয়-উপমহাদেশে মুসলিম লীগ পাকিস্তানে জ্বললেও ভারত আর বাংলাদেশে কিন্তু টিম টিম। আর স্বাধীন ভারতে হিন্দু সংগঠণ গুলি দুর্বার গতিতে বাড়ছে। আরএসএস বিজেপি সরকারকে নিয়ন্ত্রন করে। আরএসএস-বিজেপি এখন মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দোসর। আবার তারা ইতালির মুসোলিনীর ফ্যাসিবাদী ও জার্মানির হিটলারের নাৎসিবাদী (ব্রাহ্মন্যবাদ) নীতি অবলম্বন করে। আবার এরাই ইজরায়েলের জায়নবাদকে শুভেচ্ছা জানায়। বঙ্কিম ছিলেন ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ভক্ত। আর এখন এরা নয়া উপনিবেশবাদ অ্যামেরিকার দোসর, আর তাই আহমেদ ছফার ‘শতবর্ষের ফেরারিঃ বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়’ আমার কাছে একটি প্রাসঙ্গিক নিবন্ধ, অন্তঃপক্ষে আজকের ভারতের হিন্দুত্ববাদের দাপট উপলদ্ধি করলে। আর আবুল কাসেম ফজলুল হক সহ যারা বঙ্কিমকে সাফাই দেন তারা হিন্দুত্ববাদীদের হাতে অস্ত্র তুলে দেন।
তথ্যসুত্রঃ
১) বঙ্কিম উপন্যাস সমগ্র, রিফ্লেক্ট পাব্লিকেশন, কলকাতা পশ্চিমবঙ্গ, ভারত
২) আহমেদ ছফা সঞ্জীবনী, জাতীয় সাহিত্য – ১, সলিমুল্লাহ খান, আগামী প্রকাশনী, ঢাকা
৩) কবিতার জন্য এবং অন্যান্য, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, প্যাপিরাস, কলকাতা
৪) সাম্প্রদায়িকতা, বদরুদ্দিন উমর, ঢাকা
৫) দৈনিক কালান্তর শারদীয় ১৪১৫, কলকাতা
৬) বাংলাদেশের ইতিহাস, রমেশচন্দ্র মজুমদার, তৃতীয় খন্ড, কলকাতা
৭) হিন্দু মেলার ইতিবৃত্তি, যোগেশ চন্দ্র বাগল, কলকাতা (১৯৬৮)
৮ ) বাঙালী বুদ্ধিজীবি ও বিচ্ছিন্নতাবাদ, ডাঃ অমলেন্দু দে, রাজ্যপুস্তক পর্ষদ, কলকাতা (১৯৯১)
৯) বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক, ডঃ নজরুল ইসলাম, মিত্র ঘোষ, পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ (কলকাতা)
১০) ইতিহাস ও সাহিত্যে সাম্প্রদায়িকতা, মোহাম্মদ সাদউদ্দিন, শোভা প্রকাশ, ঢাকা
১১) বঙ্কিমচন্দ্রের মুসলমান চর্চা, আমিনুল ইসলাম, লেখা প্রকাশনী (কলকাতা)
১২) মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য, আনিসুজ্জামান।
তৃতীয় অংশের জন্য এখানে ক্লিক করুন।
দ্বিতীয় অংশের জন্য এখানে ক্লিক করুন
প্রথম অংশের জন্য এখানে ক্লিক করুন
