১৫ই অগস্ট আসন্ন। পুরো দেশ স্বাধীনতার গন্ধে মেতে উঠেছে। দীর্ঘ ২০০ বছরের ইংরেজ শোষণের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার মহানন্দে মেতে উঠেছে দেশ। এখন দেশ স্বজাতি দ্বারা পরিচালিত। দেশের সংবিধান স্বদেশীয় পন্ডিতবর্গের হস্তে হয়েছে রচিত। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের সর্বস্তরের সকল শ্রেণী-সম্প্রদায়ের মানুষদের অধিকার ও মর্যাদা অতি গৌরবের সাথে হয়েছে লিপিবদ্ধ। তাই তো, অশ্রু সজল দেশবাসীর মুখঃনিসৃত ‘সারে জাহাঁ সে আচ্ছা’ ধ্বনি প্লাবিত দেশের আনাচেকানাচে। ছোট-বড়ো, ধনী-গরীব, নারী-পুরুষ সকলের সুরে সুরে কলরব তুলে ‘জনগণমন’ ও ‘বন্দেমাতরম’ দেশের আকাশ বাতাস গুঞ্জরিত ও মুখরিত করে তুলেছে। সবার মনের গহীণে জোরালো দেশপ্রেম জেগে উঠেছে। দেশ আজ ঐতিহাসিক দিনের সামনে দাঁড়িয়ে প্রহর গুনছে স্বাধীনতার জয়গানে, খুশির মহানন্দে, জয়-উল্লাসে আরো একটি বার নিজেকে হারিয়ে দিতে।
“হাজারো প্রাণ হারিয়ে এসেছে এ মহা দিন
জয়-উল্লাসে মেতে উঠতে করোনা কোনো ক্ষীণ।
দিয়াছে তাহারা প্রাণবলি দেখিতে তোমাদের খুশি
আছে তাহারা চেয়ে আজো দেখিতে তোমাদের হাসি”
উদার ভারতবাসীর উদারতায় বিশ্বাসঘাতকতার বিষাক্ত থাবা ফেলে ইংরেজরা পুরো দেশকে নিজের হাতের মুঠোয় করে নিয়েছিল। আর ফলস্বরূপ ভারতীয়দের দিয়েছিল নির্মম অত্যাচার, নির্যাতন, উৎপীড়ন, অপমান, অমর্যাদা প্রভৃতির অঢেল ঝুড়ি ভর্তি উপঢৌকন। ভারতীয়দের বাড়ি গাড়ি, ধন দৌলত, উপার্জিত সম্পদ প্রভৃতি তারা করায়ত্ত করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে ভারতীয়দের কাঙালে পরিণত করে ছাড়ে। তাদের জীবন যাপনের যাবতীয় উপকরণ ও অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়। ছিনিয়ে নেওয়া হয় তাদের জাতিগত পরিচয়ের অধিকারও।নিজ দেশেই পরিণত হয় তারা বিদেশীতে!
ভারতীয়দের সব কিছু ছিনিয়ে নিতে পারলেও অভিশপ্ত ইংরেজ ভারতবাসীর মনের গহীণে লুকিয়ে থাকা প্রবল মাতৃ-প্রেম থেকে তাদের বঞ্চিত করতে অক্ষম হয়। আর তার উপরে ভর করে দেশের প্রান্তে প্রান্তে বিভিন্ন পত্র পত্রিকা, লেখনী, বক্তৃতা, সংগঠন প্রভৃতিরূপে গজিয়ে উঠতে শুরু করে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন। দেশের আকাশ বাতাস যখন ইংরেজ শোষণে থমথমে ও ভীত-সন্ত্রস্ত ঠিক তখনই দেশের মাটি ফুঁড়ে কিছু বীর মানবের উত্থান হয়। দেশ ও জাতিকে স্বরাজ ফিরিয়ে দিতে তারা বদ্ধপরিকর ও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে ওঠে। সেই মহান লক্ষ্যে পৌঁছতে ইংরেজদের সবধরণের ঘৃণতম কৌশল তাদের ভীত ও পিছপা করতে ব্যর্থ হয়। তাদের গুলি বারুদের মশাল হাজারো দেশপ্রেমীর অকাল প্রয়াণ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে। ভারতীয়দের রক্তে ভারতের মাটি তারা লাল করতে সক্ষম হয়েছে কিন্তু, তাদের দেশপ্রেমকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।

মহাত্মা গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, মাওলানা আবু কালাম আজাদ, ভগৎ সিংহ, আশফাকুল্লাহ খান, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল, লালা লাজপত রায়, বালগঙ্গাধর তিলক প্রমুখ বীর সন্তানের হাত ধরে ভারতমাতা নতুন পথ চলতে শুরু করে। স্বাধীনতার পথ। ইংরেজ শোষণ ও তোষণ দ্বিগুণ বর্ধিত হলেও ভারতবাসীর ইচ্ছাশক্তি ছিল অটুট। যার কাছে শক্তিশালী, অত্যাচারী, অভিশপ্ত, বর্বর ও অমানবিক ইংরেজশক্তি নত শিকারে বাধ্য হয়। অবশেষে ঘোষিত হয় দেশের স্বাধীনতা। জয় উল্লাসের ঢেউ দেশের আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলে। জল ছমছম চোখে ভারতবাসী একে অপরের আলিঙ্গনে লিপ্ত হয়। হাজারো শহীদী আত্মা সবার অজ্ঞাতে স্বপ্ন পূরণের স্বাদ আস্বাদন করে।
অবশেষে, যে লড়াই ভারতমাতার বীর সন্তানেরা শুরু করেছিল, যে মহান স্বপ্ন পূরণে ক্ষুদিরাম, ভগৎ সিং-রা হাসতে হাসতে ফাঁসির ফান্দা গলায় পরে নিয়েছিল, যে মহা উৎসবের ভাবনা গান্ধী, নেতাজী, মাওলানা আজাদ প্রমুখরা প্রথম ভেবেছিল, যে দিনের শুভ স্বাগতম ও শুভ উদ্বোধন পন্ডিত নেহরুর হাতে হয়েছিল, আজ আমরা সেই ঐতিহাসিক ও আবেগজড়িত দিনের সামনে দাঁড়িয়ে। আনুষ্ঠানিক ও সম্মিলিত ভাবে জাতীয় জয় গান গেয়ে আরো একটি বার আকাশ বাতাস মুখরিত করে তুলতে ও বিশ্বভূবনকে অবগত করার মানসে প্রস্তুত যে -আমরা স্বাধীন।
আমরা কি সত্যিই স্বাধীন?
সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে দেখা যায় আজকের ভারতবাসী তদানীন্তন কালের ইংরেজ আমলের ন্যায়ই করুণ অবস্থায় জীবন অতিবাহিত করে চলেছে। ইংরেজ আমলে ভারতীয়রা অত্যাচার, নির্যাতন ও উৎপীড়নের শিকার হয়েছিল কিন্তু আজ স্বাধীন ভারতেও তার ব্যতিক্রম কিছু নয়। বরং আরো নির্মম, বর্বর, বিভৎস্য ও লোমহর্ষক যে, আজ ভারতীয়রা স্বজাতি কর্তৃক নির্যাতিত হয়ে থাকে। ইংরেজরা লুটতরাজ চালিয়ে ছিল, বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, ডিভাইড এন্ড রুল খেলেছিল, সর্ব প্রান্তে অশান্তি সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু আফসোস! আজ দেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও এসবের পুনরাবৃত্তি অহরহ হয়েই চলেছে। স্বজাতিরাই দেশ লুট করার কাজে যোগ দিয়েছে। দেশীয় শাসকেরাই দেশবাসীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতার পরিচয় দিচ্ছে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ প্রভৃতির নামে বিভেদ চরমতম রূপ পরিগ্রহণ করেছে। অশান্তি সর্বত্র বিরাজমান। সহযোগীতা, সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও ঐক্যের অভাব স্বাধীনতার ৭২ বছর পরেও ভারতমাতা অনুভব করে চলেছে। দেশীয় ব্যক্তি স্বজাতির থেকে নিরাপদ নয়। এই বিভৎস দিনের বাসনাই কি বীর সন্তানেরা আত্মবলিদান দিয়েছিলেন? এমন রক্তপিপাষু দেশ কি তাঁরা গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন? তাঁরা কি এমনই বিশৃঙ্খলাপূর্ণ স্বাধীন দেশ চেয়েছিলেন? এটাই কি প্রকৃত স্বাধীনতা? আজ ঐতিহাসিক মূহুর্তে দাঁড়িয়ে বীর শহীদদের স্মরণের দ্বারা কি এমন দেশের পুষ্প্যমাল্য তাঁদের চড়াব যেখানে হাজারো মায়ের সন্তান বুক ভাঙা ব্যথা নিয়ে কেঁদে চলেছে, হাজারো পিতৃহারা, মাতৃহারা, পুত্রহারা, কন্যাহারা পরিবার আর্তনাদ করে চলেছে কিন্তু সহায়তায় কেউ নেই? হাজারো সন্তান বাক্ স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেছে? বেঁচে থাকার অধিকার হারিয়ে ফেলেছে? তার মৌলিক অধিকারে আঘাত হানা হচ্ছে? এটাই কি স্বাধীন দেশ বলতে যা বোঝায়? না, এ দেশ আজও স্বাধীন নয়। শুধু ইংরেজ কবল থেকে মুক্তি পেয়েছে মাত্র!
(মতামত লেখকের নিজস্ব।)
(লেখক আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র)

