বুধবার বিজেপির ডাকা বনধ রুখতে কড়া পদক্ষেপ রাজ্য প্রশাসনের, ছুটি বাতিলের নির্দেশ জারি

বুধবার বিজেপির ডাকা বনধ রুখতে কড়া পদক্ষেপ রাজ্য প্রশাসনের, ছুটি বাতিলের নির্দেশ জারি

বুধবার বন্‌ধের বিরুদ্ধে রাজ্যকে সচল রাখতে সোমবার নবান্নে বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুপস্থিতিতে মন্ত্রী এবং আমলাদের নিয়ে গঠিত কমিটি। বন্‌ধের দিন, আইনশৃঙ্খলা, পরিবহণ, সরকারি কার্যালয়ে হাজিরা-সহ সব বিষয়গুলি নিশ্চিত করতে নির্দেশিকা দিয়েছেন কমিটির সদস্যরা। অর্থ দফতরও কোন রকমের সময়ের অপচয় না করে নির্দেশিকা জারি করেছে সরকারি কর্মচারীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে। এবং বন্‌ধের পরের দিন ছুটি নামঞ্জুর করারও নির্দেশিকাও এই প্রথম দেওয়া হল, বলেছেন অর্থদপ্তরের কর্তারা।

সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে, মন্ত্রিগোষ্ঠীর বৈঠক থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এলাকায় এলাকায় শান্তি বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট জেলার নেতা মন্ত্রীরা নজর রাখবেন। অশান্তি রুখতে পুলিশকে সতর্কতামূলক সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে উন্নয়নে অনেক দিন পরে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি। জনগনের আস্থা যখন পেল না তখন বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। এখন চারদিকে পঞ্চায়েতের বোর্ড গঠন হচ্ছে, হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষা চলছে। জনগন সতর্ক আছে। আমরা সতর্ক আছি, প্রশাসনও থাকবে। পরিবহণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে বলা হচ্ছে, তারা বাস, ট্যাক্সি চালাবে। প্রশাসনিক দিক থেকে মানুষকে নিরাপত্তা দেওয়া, কোনও জায়গায় বিজেপি বা তাদের শাখা সংগঠনগুলি হুমকি বা উস্কানি দিলে যথাযথ ভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিগত দিনে বাংলাকে সচল রেখেছেন, আগামই ২৬ তারিখেও সচল রাখুন।’’ একইভাবে শাসকদলের তরফে কোনও প্ররোচনায় পা না দিয়ে বনধের বিরুদ্ধে পাড়ায় পাড়ায় প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। কর্মীদের উদ্দেশে নির্দেশ, কোনও অবস্থাতেই স্বাভাবিক জনজীবন বন্ধ করা যাবে না।

সোমবার পৃথক দু’টি জনস্বার্থ মামলা দায়ের করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টে বুধবারের প্রস্তাবিত বনধ নিয়ে। প্রথম মামলাটি দায়ের করেছে ‘অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরাম’। ‘অল ইন্ডিয়া মাইনরিটি ফোরাম’ এর আইনজীবী ইদ্রিস আলির আবেদনে বলা হয়েছে, “কলকাতা হাইকোর্ট অনেক আগেই যে কোনও বনধকে বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছে। আগামিকালের  বুধবারের বনধ প্রত্যাহার করতে বিজেপি এবং আরএসএস-কে নির্দেশ দিক আদালত। প্রয়োজনে বনধের উপর স্থগিতাদেশ জারি করা হোক। আর রাজ্যের স্পর্শকাতর জায়গায় যেখানে গোলমালের আশঙ্কা থাকবে, সেখানে সেনা মোতায়েন করার জন্য আদালতের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হক রাজ্যকে। দ্বিতীয়টি দায়ের করা হয়েছে কলকাতা হাইকোর্টের এক আইনজীবী রমাপ্রসাদ সরকার এর দ্বারা। আইনজীবী জানান, পুজোর মরসুমে বনধ হলে ব্যবসায়ী তো বটেই সবথেকে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন সাধারণ মানুষ ও দিনমজুরেরা।

প্রতি বারের মতোও এ দিন অর্থ দফতর নির্দেশিকা জারি করে জানিয়ে দিয়েছে, উপযুক্ত এবং আপৎকালীন কোনও কারণ ছাড়া ওই দিন কোনও কর্মীর ছুটি মঞ্জুর করা হবে না। নির্দেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর সে দিনের বেতন কাটা হবে এবং গোটা কর্মজীবনের থেকে একদিন কেটে নেওয়া (ডায়েস নন) হবে। বন্‌ধের দিন অর্ধদিবসের ছুটিও মঞ্জুর করা হবে না। সোমবার পর্যন্ত যাঁরা ছুটিতে রয়েছেন, তাঁদের মঙ্গলবার কাজে যোগ দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তাৎপর্যপূর্ণ, বন্‌ধের আগের দিন মঙ্গলবার এবং পরের দিন বৃহস্পতিবার ছুটি দেওয়া হবে না।

ভোর পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বন্‌ধের দিন কন্ট্রোল রুম চালু রাখবে পরিবহণ দফতর। বুধবার কলকাতায় অতিরিক্ত ৫০০ বাস রাস্তায় নামানো হবে। ফেরি ৩৫ টির পরিবর্তে ওই দিন থাকবে ৫০ টি। ট্রামের সংখ্যা দ্বিগুণ করে প্রায় ৮০ টি ট্রাম চালানো হবে। উত্তরবঙ্গ এবং দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহণ নিগম অতিরিক্ত বাস নিজেদের ডিপোয় মজুত রাখবে। বন্‌ধ সংক্রান্ত কোনও গোলমালে বেসরকারি বাসের, গাড়ির কাঁচ ভাঙলে ৭৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে। আরও বড় ক্ষতি হলে সেক্ষেত্রে ৬ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ক্ষতিপূরণ পাওয়া যেতে পারে। বেসরকারি কোনও বাস বা মিনিবাস উপযুক্ত কারণ ছাড়া রাস্তায় না নামলে সংশ্লিষ্ট মালিকের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। প্রয়োজনে পারমিট বাতিলও করা হতে পারে বলে জানিয়েছেন পরিবরণমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।

এদিকে রাজ্য বিজেপি বনধকে কতটা সফলতা দিতে পারবে তা নিয়ে সংসয় রয়েছে বিজেপির অন্দরেই। মূলত যেখানকার গণ্ডগোলকে সামনে রেখে বিজেপি বনধের ডাক দিয়েছে, সেই ইসলামপুরে দেখা যায়নি বিজেপির রাজ্য সভাপতিকে। গত কয়েকদিন ধরে তিনি উত্তরবঙ্গের দক্ষিণ দিনাজপুরে রয়েছেন। কিন্তু সেখানে থাকলেও উত্তর দিনাজপুরে দিলীপ ঘোষ কেন গেলেন না, তা নিয়েও দলের অন্দরে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। যদিও তাঁর দাবি, আগে থেকেই রাজনৈতিক কর্মসূচি স্থির করা ছিল। মঙ্গলবার রায়গঞ্জে জনসভা সেরে কলকাতায় ফিরবেন তিনি। বুধবার দিলীপবাবু সহ একাধিক নেতা কলকাতা থেকে বনধের সমর্থনে পথে নামবেন। ওইদিন হাজরা এবং সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউর বিজেপি অফিস থেকে বড় দু’টি মিছিল বের হবে। দু’টোরই গন্তব্য ধর্মতলা। রাজ্য কমিটির এক নেতার দাবি, দীর্ঘদিন ধরে দলের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) সুব্রত চট্টোপাধ্যায়ের পাত্তা নেই। দিলীপবাবু উত্তরবঙ্গে পড়ে রয়েছেন। বন্ধ সফল করার জন্য শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে যে সমন্বয় প্রয়োজন, তার ছিটেফোঁটাও নেই। শুধু তাই নয়, ডিসেম্বর মাসে গোটা রাজ্যে রথযাত্রা কর্মসূচি এই মুহূর্তে গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো হয়ে দেখা দিয়েছে।

 

এদিকে, বিজেপির ডাকা বুধবারের ১২ ঘণ্টার বাংলা কে সমর্থন না করার কথা আগেই ঘোষণা করেছে সিপিএম। কিন্তু গুলিতে দুই ছাত্রের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনার ব্যাপারে দল যেহেতু বিজেপির মতোই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুলিস ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে শুরু থেকেই সুর সপ্তমে চড়িয়েছে, তাই বুধবার  নিয়ে তাদের মামুলি আপত্তি নিয়ে শেষ পর্যন্ত শাসক শিবির প্রশ্ন তুলতে পারে বলে মনে করছে আলিমুদ্দিন। এমনকী, বনধ আংশিক সফল হলেও তা নিয়ে বিজেপি-সিপিএমের মধ্যে গোপন বোঝাপড়ার অভিযোগে সরব হতে পারে তৃণমূল। সেই কারণে কাল দল ও গণসংগঠনগুলির তরফে কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় পূর্ব নির্ধারিত যাবতীয় রাজনৈতিক কর্মসূচি বাতিল করা দূরের কথা, আরও অধিক গুরুত্ব দিয়ে পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নেতৃত্বের পক্ষ থেকে। উল্লেখ্য, দলের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র বিজেপির ডাকা এই বনধকে ‘সার্কাস’ বলে অভিহিত করেছেন।