সংঘপরিবারের উত্থানে আমাদের ভূমিকা

~তায়েদুল ইসলাম

আজ চতুর্দিকে সংঘপরিবারের আলোচনা পক্ষে ও বিপক্ষে। অনেক আইন বিরোধী ও অপরাধ মূলক কাজ তারা করে চলেছে। দেশ জুড়ে চলে আসছে তাদের অতীত অপকীর্তি। তারা বিরোধিতা করেছে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের। দেশের মৌলিক কাঠামোর পরিবর্তন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। অপরদিকে অনেকেই তাদের এই কাজের বিরোধিতা করে অনেক বড় বড় কথা বলছি। বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে। মানুষ কাছাকাছি আসছে। বৃহত্তর প্রতিবাদের কথা ভাবছে। সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক সর্বত্র ফ্যাসিবাদী শক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের লেখা, সংবাদ ছাপা হচ্ছে। দলিত ও মুসলিম সমাজের বাইরেও ফ্যাসিবাদ বিরোধী অনেক ব্যক্তি, সংগঠন দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান ফ্যাসিস্ট শক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু পরিস্থিতির ভয়াবহতার মূল্যায়নে স্বচ্ছতার অভার বোঝা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা ও ফ্যাসিবাদ এর মধ্যে পার্থক্যকে গুলিয়ে ফেলছি। বাস্তব কোন কর্মসূচি না নিয়ে সভা-সমিতির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছি।


আমাদের বুঝতে হবে বাস্তব পরিবেশ -পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মসূচির অগ্ৰাধিকার পালটিয়ে যায়। সাম্প্রদায়িকতার পিছনে সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী থাকে না। থাকে না জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বক্তব্য। সাম্প্রদায়িকতা তার কর্মসূচি বাস্তবায়নে কৌশল গ্ৰহণ করে। দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। আইনের ফাঁক-ফোকরের সুযোগ গ্ৰহণ করে। কখনোই আইনকে চ্যালেঞ্জ করে না। আইন হাতে তুলে নেয় না। যদিও সাম্প্রদায়িকতা সুস্থ সমাজের জন্য ক্যান্সার স্বরুপ। কিন্তু ফ্যাসিবাদ তথ্যযুক্তি, সত্য-মিথ্যা যার ধার ধারে না। আইনকে চ্যালেঞ্জ করে। জোর-জবরদস্তি বিরোধী শক্তিকে খুন করে। মানুষে মানুষে ঘৃণা-বিদ্বেষ তৈরী করাকেই প্রধান হাতিয়ার করে। গোটা সমাজকেই ভীতু ও সন্ত্রস্ত করে তোলে।
আজকে গেরুয়া ফ্যাসিবাদী শক্তি দেশে সেই কাজই করছে। দেশবাসীর মধ্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ তৈরী করে চলেছে। দেশবাসির উপর চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি চালাচ্ছে। সফল হলে দেশের চুড়ান্ত বিপর্যয় হবে। দেশের সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করবে। নিজেদের ছাড়া বাকী সকল দেশবাসীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে গ্ৰহণ করবে।
এই জটিল সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশবাসীর অগ্ৰাধিকার হতে হবে প্রবল বেগে ধেয়ে আসা ফ্যাসিবাদকে প্রতিহত করা।

অভিজ্ঞতা বলছে, অন্য রাজনৈতিক দলগুলি ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আন্তরিক না হওয়ার কারণে সে পথে এগোবে না। এ ক্ষেত্রে নাগরিক সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কিন্তু নাগরিক সমাজ যত বেশি ফ্যাসিবাদের বিরোধীতায় সচেতন ও নিষ্ঠাবান তার চেয়ে বেশি সচেতন ও নিষ্ঠাবান দলীয় আনুগত্য প্রকাশে। ফলে সমাজের অবস্থা যতই ভয়বহ হোক না কেন, রাজনৈতিক দলগুলি পরিস্থিতির মুকাবিলায় কোন উদ্যোগ গ্ৰহণ না করলে কর্মী-সমর্থকরা এগিয়ে আসবেন না। আমরা এতটাই দলীয় রাজনীতি-আসক্ত যে, কোন বিষয়েই দলীয় রাজনীতি নিরপেক্ষ কোন কর্মসূচি নিতে পারি না।

গতবছরের একটি ঘটনা তার জলন্ত উদাহরণ। দক্ষিণ ২৪ পরগণায় ১৭ থেকে ২৩ ডিসেম্বর বজরং দল ছাত্র-ছাত্রীদের অস্ত্র প্রশিক্ষণ দেয়। এই বেআইনি, সন্ত্রাসি মানুষ হত্যার পরিকল্পিত কর্মসূচির বিরুদ্ধেও কোন প্রতিবাদ সংগঠিত হল না। বিশেষ করে যে দলিত ও মুসলিমদের বিরুদ্ধে প্রয়োগ করার জন্য এই প্রশিক্ষণ বলে জানিয়েছেন ঐ দলের নেতারা গণমাধ্যমকে সেই দলিত ও মুসলিমদের পক্ষ থেকেও কোন প্রতিবাদ চোখে পড়েনি। কিন্তু এখনো সময় আছে সে অচল অবস্থাকে ভেঙে ফেলতে চেষ্টা শুরু করার। নাগরিক সমাজ সে চেষ্টা শুরু করতে পারে। জন-সমাজকে সে কাজে আহ্বান করতে পারে। জনগণ এগিয়ে আসলে সমর্থকদের চাপে দলগুলিও বাধ্য হবে।


দ্বিতীয় পথ হল, জনগণকে নিজ নিজ এলাকায় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ফ্যাসিবাদী শক্তির পাল্টা শক্তি অর্জন করতে হবে। ফ্যাসিবাদকে হারাতে হবে।
কিন্তু দেশজুড়ে দলিত ও মুসলিম হত্যার ফ্যাসিবাদী আক্রমণের বিরুদ্ধে সংগঠিত কোন সভা, সমিতি, প্রতিবাদ সভাতেই সে চেতনা, চিন্তার স্বচ্ছতা ও সুর পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তাই সঠিক দিশা ও পরিকল্পনা বিহীন বিরোধীতা দেশকে ফ্যাসিবাদের আক্রমণ থেকে বাঁচাতে পারবে না। তাই দেশের সামনে ফ্যাসিবাদের আক্রমণের চেয়েও বড় সমস্যা সাধারণ জনগণের অসচেতনতা, ফ্যাসিবাদ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলির অনৈক্য, দলিত ও মুসলিম নেতাদের দিশাহীনতা।

কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি ফ্যাসিবাদী এই শক্তির বাড়বাড়ন্তের পিছনে আমাদের কোন ভূমিকা আছে কিনা? ধরুন, বিজেপি বিরোধী রাজনৈতিক ও গণসংগঠনগুলি আরএসএস বা তার কোন শাখা সংগঠন এর বিরুদ্ধে কোন কর্মসূচি নিয়েছে? আরএসএস এর চিন্তা ভাবনার বিরুদ্ধে কর্মীদের শিক্ষিত করার কোন কর্মসূচি গ্ৰহন করেছে? আমরা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, বিশ্ব পূঁজিবাদ, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে গলা ফাটিয়েছি, কাগজ কালি খরচ করেছি, ধ্বংস করার আস্ফালন করেছি। কিন্তু কখনো সংঘপরিবারের বিরুদ্ধে কোন কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেছি বলে তো মনে করতে পারছি না। অথচ জীবনের সিংহভাগটাই কাটিয়ে দিলাম বামপন্থীদের সাথে। যদি এই রাজ্যে বিজেপি না আসত, তা হলে কি এই রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলোর মুখে আরএসএস এর নাম শোনা যেত? এতদিন এর বিরুদ্ধে কোন কথা বলেনি কেন? তা হলে কি এই ভাবনাই সঠিক, বিজেপি ভোটে ভাগ বসাতে আসছে বলেই বিরোধিতা? আমরা বিজেপিকে ভোটের ভাগ দেওয়ার বিরোধী। কিন্তু সংঘপরিবারের কর্মসূচির বিরোধী নই?

 
আমরা কেউ রাজনৈতিক কর্মী কেউ মানবাধিকার কর্মী কেউ বিজ্ঞান মঞ্চের কর্মী সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী মঞ্চের কর্মী সংঘপরিবারের কর্মসূচির বিরুদ্ধে সেমিনার, মিটিং, মিছিল নিয়ে ব্যস্ত থাকি কখনো খেয়াল করেছি আমাদের পরিবারের সদস্য সংঘপরিবারের কোন না কোন শাখার সঙ্গে যুক্ত? আমরা হয় উদাসীন থেকেছি, না হয় মৌন সমর্থন করেছি একেই বলে ভাবের ঘরে চুরি ঘরে মৌন সমর্থন বাইরে বিরোধিতা আমাদের সংখ্যা কি খুব কম?


সংঘপরিবারের সমাজসেবা বা নাগরিক সেবার অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। তারমধ্যে উল্ল্যেখযোগ্য বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। সে সব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সংঘপরিবারের ভাবাদর্শে গড়ে তোলা হয়। আমরা সব জেনেও আমাদের ছেলেমেয়েদের সেখানে পাঠাই। আমরা যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি তাদের সমর্থক হিসেবে গড়ে তুলছি নিজেদের ছেলেমেয়েকে। এমনকি যে আরএসএস এর অন্যতম উদ্দেশ্য হল মুসলিম মুক্ত বা মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক যুক্ত ভারত গঠন সেই আরএসএস ভাবাদর্শে পরিচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রমরমিয়ে চলছে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে। মুসলিমরাই সরবরাহ করছে প্রায় অর্ধেক পড়ুয়া।
তাদের ভাবাদর্শে জনগণকে শিক্ষিত করার জন্য সংঘপরিবারের রয়েছে অনেক সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান। রয়েছে প্রচুর শিক্ষিত ও নিবেদিত প্রাণ কর্মি ও নেতা। প্রতি দিন প্রতি মুহূর্তে নীরবে পরিকল্পিত ভাবে কাজ করে চলেছে। বাহ্যিক প্রচার ছাড়াই। তাদের প্রচারের অন্যতম প্রধান কৌশল হল ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে প্রচার। গোপনে, সত্য-মিথ্যা যাচাই করার সুযোগ রাখে না। একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা হল, কয়েক মাস আগে দঃ ২৪ পরগণার সন্তোষপুরে এক দলিত নেতার বাড়িতে রাত কাটিয়ে ছিলাম। ঘুমানোর আগে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে পরিচয়, হালকা আলোচনার সময় একজন সদস্য আমাকে প্রশ্ন করে বসলেন আপনি জানেন অভিষেক ব্যানার্জি মমতা ব্যানার্জির নিজের ছেলে“? উত্তরে জানি না বলায়, প্রশ্নকর্তা যা বললেন তার ভুল মূল কথা মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে এক জন মুসলিমের বিয়ে হয়েছিল। অভিষেক তার নিজের ছেলে। পরে বিয়ে টিকেনি। প্রথম থেকেই তাকে ভাইপো বলে চালিয়ে আসছে। কিন্তু নিজের সন্তান বলে সমস্ত সম্পদ তার নামে করছে। আমি প্রসঙ্গ ঘোরাতে চাইলে প্রশ্ন করেন “আপনারা এখনো সংখ্যালঘু দাবি করেন কেন? আগে সংখ্যালঘু ছিলেন। এখন তো সংখ্যায় অনেক। পাকিস্তানে আমরা সংখ্যালঘু। লক্ষ্য করছি আলোচনায় সবাই অংশগ্রহন করছে। সবাই তাকে সমর্থন করছে। আলোচনা স্বাস্থ্যকর থাকছে না বুঝে ঘুম আসছে বলে শোয়ার জায়গায় চলে যায়। সেদিন বুঝেছি ঐ দলিত পরিবারের সদস্যরা সংঘপরিবারের মিথ্যা অপপ্রচারকে সত্য বলে বিশ্বাস করে এবং কেউ কেউ সক্রিয় কর্মি হিসেবে সেই মিথ্যার প্রচারও করে।

তাই মনে প্রশ্ন জাগে, শুধুমাত্র আলোচনা, মিছিল -মিটি়ং, লেখা-লেখির মাধ্যমে কি ফ্যাসিবাদীদের রোধ করা যাবে? যেমন, গতবছর রামনবমীর সময় আসানসোলের শিবগাতুল্লাকে হত্যা করে সংঘপরিবারের গুন্ডারা। তারপর তার পিতার ভূমিকার জন্য অনেক আলোচনা, প্রতিবাদ সভা, সম্প্রীতি সভা, লেখালেখি হল। তাতে কি জনগণকে এতটা সচেতন করা গেল যাতে সংঘপরিবারের সদস্য সংগঠনগুলোর নতুন সদস্য সংগ্রহ করতে সমস্যা হচ্ছে? অথবা তাদের কিছু সদস্য ভুল বুঝতে পেরে সেখান থেকে বেরিয়ে এসেছে? আমরা যদি হিসেব করি বুঝতে পারব শিবগাতুল্লার হত্যার দিন থেকে আজ পর্যন্ত যত সংখ্যক আলোচনা, সভা, লেখালেখি হল তার অনেকগুণ বৃদ্ধি পেল সংঘপরিবারের সাংগঠনিক শক্তি। আমরা যে কয়েক ঘণ্টা ময়দানে গলা ফাটাচ্ছি সে কয়েক ঘণ্টাতেই তারা হয়ত আমারই পরিবারের কোন সদস্যের বা প্রতিবেশী কারোর মগজ ধোলাই করে ফেলল। এমনকি এই এক বছরের মধ্যে রাজ্যে অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবিরের সংখ্যাও বেড়েছে। তা হলে আমাদের নানা কিসিমের প্রতিবাদ অস্ত্র প্রশিক্ষণ শিবিরের সংখ্যা কমাতে তো পারলোই না, বরং বৃদ্ধি পেল। যে এলাকায় এ সব হচ্ছে সে এলাকার জন্য আমরা বিশেষ কর্মসূচি নিতে পারতাম। এলাকার জনসাধারণকে সচেতন করে গণপ্রতিবাদ -প্রতিরোধ গড়ে তোলা যেত।  প্রশিক্ষণ শিবিরে ব্যবহৃত অস্ত্র বেআইনি কি-না তা তদন্ত করে দেখার জন্য আন্দোলন গড়ে তোলার কথাও বিবেচনা করা উচিৎ ছিল। তদন্ত করতে সরকারকে নির্দেশ দেওয়ার জন্য উচ্চন্যায়ালয়ে জনস্বার্থের মামলা করা যেত। আমরা কিন্তু এ সবের কোন পথেই হাঁটিনি। তা হলে আমরা কি এ সব বিষয়ে ওয়াকিবহাল নয়? না কি সংঘপরিবারের বিরোধিতায় আন্তরিক নই? না কি ভয় করছি? ঐটুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে নিজেদের শেষ রক্ষা করতে পারব তো?

আমাদের নিরবতা ও বিছিন্নতা ফ‍্যাসিবাদের উত্থানকে ত্বরান্বিত করবে।
ছোটবেলায় জেনেছিলাম বাংলা আজকে যা ভাবে বাকী ভারত আগামিকাল তা ভাবে। সাম্প্রতিক ঘটনাবলি দেখে মনে হচ্ছে বিষয়টা পাল্টিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মহারাষ্ট্রের ভীম কোরগাঁওয়ের ঘটনায় বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাই এক সময় ছিল দলিতদের শক্তিশালি ঘাঁটি। এখানেই তাঁরা অধিকার করেছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতা। বাংলার দলিতরাই সংবিধান রচনা কমিটির চেয়‍্যারম‍্যান ডঃ বি আর আম্বেদকরকে সংবিধান পরিষদে পাঠিয়েছিলেন। আর আজ তাঁরা দিশাহীন,গতিহীন। নেতৃত্বহীন। শত্রুকে মিত্র বলে গ্ৰহণ করছে। শত্রুর ষড়যন্ত্রে সামিল হয়ে বন্ধুর বিরুদ্ধে অস্ত্র শানাচ্ছে। এই অবস্থার জন‍্য মুসলিম ও দলিত উভয় সম্প্রদায়ের বর্তমান নেতৃত্বই দায়ী। অধিকাংশই জানে না নিজেদের অতীত ইতিহাস। যারা জানে তারা সমাজ বিছিন্ন।নেতার চেয়ে দলের সংখ‍্যা বেশি। নিজেদেরই অন‍্য নেতার সাথে একই মঞ্চে বসতে নারাজ। কিন্তু শত্রু পক্ষের নেতার সাথে বসতে পারাকে সৌভাগ‍্য মনে করে। ব‍্যক্তি ও পরিবারের স্বার্থে সমাজের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে বা সমাজকে বিক্রি করে দিতে দ্বিধা করে না। এদেরকেই আল্লামা ইকবাল ধিক্কার জানিয়েছেন এই ভাষায় “মুখ‍্য তুই, গোটা কতক ফুলেই তোর ভরলো প্রাণ, চাইতে যদি মিলতো তবে সবটুকু এই ফুল বাগান”।

এর পরও আশা আছে। প্রতিদিন প্রকৃতি দেখাচ্ছে, শিক্ষা দিচ্ছে, হতাশ হতে নিষেধ করছে। বলছে, হোক রাতের অন্ধকার যতই গভীর ও ভয়াবহ, অন্ধকারের বুক চিরে আলোর রেখা ফুটে উঠবেই। সেই প্রকৃতির নিয়মেই রোহিত ভেমুলা, আফজাল, নাজিব, আফরাজুল হত‍্যা, উনা, ভীমাকোরেগাঁও এর ঘটনা বাংলার দলিত ও মুসলিমদের নাড়া দিয়েছে। নিদ ভাঙতে শুরু করেছে। চোখ কচলিয়ে আশপাশে তাকাতে চেষ্টা করছে। নিজেদের ভুল-ত্রুটিগুলোকে চিহ্নিত করতে চেষ্টা করছে।
বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট প্রতিবাদ সংগঠিত হচ্ছে। মানুষ কাছাকাছি আসছে। বৃহত্তর প্রতিবাদের কথা ভাবছে। সাপ্তাহিক থেকে দৈনিক সর্বত্র ফ‍্যাসিবাদী শক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের লেখা, সংবাদ ছাপা হচ্ছে। দলিত ও মুসলিম সমাজের বাইরেও ফ‍্যাসিবাদ বিরোধী অনেক ব‍্যক্তি, সংগঠন দেশজুড়ে ক্রমবর্ধমান ফ‍্যাসিস্ত শক্তির আক্রমণের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলার চেষ্টা করছে। নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে এসেছে ‘বন্দি-মুক্তি কমিটি’।
কিন্তু এই ‘শুভ সকালেও’ ‘কুয়াশা’ আমাদের দৃষ্টিকে আছন্ন করছে। পরিস্থিতির ভয়াবহতার মূল‍্যায়নে স্বচ্ছতার অভার বোঝা যাচ্ছে। সাম্প্রদায়িকতা ও ফ‍্যাসিবাদ এর মধ‍্যে পার্থক‍্যকে গুলিয়ে ফেলছি। বাস্তব কোন কর্মসূচি না নিয়ে সভা-সমিতির মধ‍্যে সীমাবদ্ধ থাকতে চাইছি।


আমাদের বুঝতে হবে বাস্তব পরিবেশ -পরিস্থিতি অনুযায়ী কর্মসূচির অগ্ৰাধিকার পালটিয়ে যায়। সাম্প্রদায়িকতার পিছনে সুনির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গী থাকে না। থাকে না জীবনের সর্ব ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট বক্তব‍্য। সাম্প্রদায়িকতা তার কর্মসূচি বাস্তবায়নে কৌশল গ্ৰহণ করে। দুর্নীতির আশ্রয় নেয়। আইনের ফাঁক-ফোকরের সুযোগ গ্ৰহণ করে। কখনোই আইনকে চ‍্যালেঞ্জ করে না। আইন হাতে তুলে নেয় না। যদিও সাম্প্রদায়িকতা সুস্থ সমাজের জন‍্য ক‍্যান্সার স্বরুপ। কিন্তু ফ‍্যাসিবাদ তথ‍্য, যুক্তি, সত‍্য-মিথ‍্যার ধার ধারে না। আইনকে চ‍্যালেঞ্জ করে। জোর-জবরদস্তি বিরোধী শক্তিকে খুন করে। মানুষে মানুষে ঘৃণা-বিদ্বেষ তৈরী করাকেই প্রধান হাতিয়ার করে। গোটা সমাজকেই ভীতু ও সন্ত্রস্ত করে তোলে।


আজকে গেরুয়া ফ‍্যাসিবাদী শক্তি দেশে সেই কাজই করছে। দেশবাসীর মধ‍্যে ঘৃণা, বিদ্বেষ তৈরী করে চলেছে। দেশবাসির উপর চূড়ান্ত আঘাত হানার প্রস্তুতি চালাচ্ছে। সফল হলে দেশের চুড়ান্ত বিপর্যয় হবে। দেশের সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তন করবে। নিজেদের ছাড়া বাকী সকল দেশবাসীকে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসাবে গ্ৰহণ করবে।
এই জটিল সংকটময় পরিস্থিতিতে দেশবাসীর অগ্ৰাধিকার হতে হবে প্রবল বেগে ধেয়ে আসা ফ‍্যাসিবাদকে প্রতিহত করা। ।


শুধু বিজেপির বিরোধিতা করে সংঘপরিবারকে পরাজিত করা যাবে না। যে কারণে বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইছি বিজেপি ক্ষমতা থেকে সরলেও সে কারণগুলি ভারতীয় সমাজ থেকে পুরোপুরি দূর হবে না। বিজেপি সংঘপরিবারের বিশাল প্রশিক্ষিত কর্মী বাহিনির মাধ্যমে দেশবাসীর একটা অংশের মনে যে বিষ ইতিমধ্যেই ঢুকিয়ে দিতে সমর্থ হয়েছে তা কি দূর হয়ে যাবে? এতদিন ধরে আমরা বিজ্ঞানমুখিতার দিকে যতটা এগিয়ে ছিলাম তারা সমাজের একাংশকে ততটায় পিছিয়ে দিয়েছে । যতটা কুসংস্কার মুক্ত হতে পেরেছিলাম ধর্মের নামে আবার তাকেই আঁকড়িয়ে ধরে ফিরিয়ে এনেছে । দেশের ইতিহাস চর্চায় উপনিবেশিক শাসকদের স্বার্থে রচিত পক্ষপাতমূলক ইতিহাস থেকে সরে আসতে শুরু করেছিলাম সংঘপরিবার আমাদেরকে সেখান থেকে সরিয়ে সম্পূর্ণ মিথ্যা ইতিহাস বিশ্বাস করাতে অনেকটা সফল হয়েছে । ধর্মীয় ঘৃণা-বিদ্বেষ ও জাতপাতের ঘৃণা- বিদ্বেষকে সাংগঠনিক ভাবে বহুগুন বৃদ্ধি করে দেশে গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে। আমরা দেশকে এ সব থেকে রক্ষা করতেই বিজেপিকে হারাতে চাইছি। বিজেপিকে রাজনৈতিক ক্ষমতার মসনদ থেকে হটানোর জন্য যে প্রচেষ্টা চালাছি জনগণের মন থেকে তাদের ঢুকিয়ে দেওয়া বিষ দূর করার জন্য সে প্রচেষ্টা বা কোন কর্মসূচি গ্রহণ করছি কি ?

বিজেপির পরিচালক আর এস এস এর দর্শনগত ভিত্তি হল এবং প্রথম থেকেই বলে আসছে তারা দেশের বর্তমান সংবিধান, আইন পালটিয়ে মনুবাদের ভিত্তিতে হিন্দুরাষ্ট্র গঠন করতে চাই। তারা হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের জন্য পরিকল্পিত ভাবে দীর্ঘ সংগ্রাম চালিয়ে যাছে। সেই সংগ্রামের অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ বা শত্রু ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতীককে  ধ্বংস করা শুধুমাত্র নির্বাচনে জেতার বিষয় নয়। বিষয়টা হিন্দুরাষ্ট্র গঠনের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। প্রখ্যাত সাংবাদিক এ জি নূরানির মতে ‘হিন্দুত্বের স্বার্থে ধর্মযুদ্ধের একটা অংশ হিসেবে সাভারকারের অনুগামিরা ৬ই ডিসেম্বর, ১৯৯২ সাল বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করে দেয়’( পৃষ্ঠা ১২১,সাভারকার ও হিন্দুত্ব)। সেই রকম ধর্মীয় মেরুকরণও কেবলমাত্র নির্বাচনী ইস্যু নয়। তাদের কাঙ্ক্ষিত হিন্দু রাষ্ট্রের ঘোষিত নীতি হল মুসলিমরা সেখানে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বাস করবে।

বিজেপি ক্ষমতায় থাক বা না থাক তার বিশাল কর্মী-বাহিনী বাবরি মসজিদের জায়গায় মন্দির নির্মাণ, ধর্মীয় মেরুকরণএর লক্ষ্যে মানুষকে ভুল বোঝাতে নিরলস কাজ করে চলেছে। ফলে লড়াইটা বিভিন্ন রাজনৈতিক দল বনাম বিজেপি নয়। লড়াইটা হতে হবে অন্যান্য রাজনৈতিক দল বনাম সংঘপরিবার। কিন্তু কোন রাজনৈতিক দলেরই সংঘপরিবার বিরোধী কোন কর্মসূচি নেই। সবাই বিজেপির বিরুদ্ধে বলছে। কিন্তু কেউ আর এস এস, সংঘপরিবারের বিরুদ্ধে বলছে না। কখনো কেউ কিছু বললেও তার মধ্যে আন্তরিকতা নেই। থাকলে বাস্তব কর্মসূচি থাকত। মনে হচ্ছে সবাই আরএসএসের ‘ অনুগত বিরোধী’র ভূমিকা পালন করছে।বিরোধীরা বিজেপি বিরোধী কিন্তু আর এস এস , বিশ্বহিন্দু পরিষদ সহ সংঘ পরিবারের অন্যান্য শাখা সংগঠনের বিরোধী নয়। হলে, তাদের সংগঠনের কতজন নেতা কর্মী সংঘপরিবারের কোন না কোন সংগঠনের সদস্য তার খোঁজ- খবর রাখার চেষ্টা করত। তাদের আদর্শগত ভিত্তির বিরুদ্ধে জনগণকে শিক্ষিত, সচেতন করত। তাদের বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে আইনগত লড়াই লড়ত।

হিন্দুরাষ্ট্রের ভিত্তি ব্রাহ্মণ্যবাদ। ব্রাহ্ম্যন্যবাদের ভিত্তি বর্ণবাদ। বিজেপি বা সংঘপরিবারের সমাজ দর্শনের ভিত্তি বর্ণবাদ। বর্ণবাদ মানবতাবাদের ,মানবিক ঐক্য ও সাম্যের  বিরোধী। ফলে বর্ণবাদ ব্যক্তিমানুষের সকল প্রকার স্বাধীনতার বিরোধী। ফলে সমাজ থেকে বর্ণবাদ নির্মূল না হলে সমাজে বিভেদ, অসাম্য ঘৃণা-বিদ্বেষ এবং জুলুম শোষণ থাকতে বাধ্য। সমাজ থেকে বর্ণবাদ দূর না হলে শ্রেণিসংগ্রামের লড়াইও সফল হবে না। তাই শ্রেণিসংগ্রামের(class struggle)  পূর্ব শর্ত জাতসংগ্রাম ( caste struggle)। এখন প্রশ্ন হল , জাতসংগ্রাম না করে , সংঘপরিবারের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি না নিয়ে শুধুমাত্র বিজেপিকে ক্ষমতা থেকে দূরে সরিয়ে রাখলে কি  বিরোধীদের সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন সফলতার মুখ দেখবে ? আমরা কি  কেউ চতুর্বর্ণ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে কোন আওয়াজ তুলছি ? চতুর্বর্ণ ব্যবস্থা যে বৈদিক ধর্মের অংশ তা কী ভাবে  আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে বাধা সৃষ্টি করে আমরা কি তা  চিন্তা- ভাবনা করে দেখেছি?     

দেশের দলিত আন্দোলনের অবস্থাও খুব বেশি  আলাদা নয়। দলিত আন্দোলনের নেতাদের বাড়িগুলিও বর্ণবাদী সংস্কৃতির ছোবল থেকে মুক্ত থাকতে পারেনি। নেতাদের অনেকেই ব্যক্তিজীবনে আন্দোলনের সফলতা দেখতে না পেয়ে হতাশ হয়ে ব্যক্তি বা পরিবারের স্বার্থের বেদিমূলে সমাজের স্বার্থকে বলি দিয়ে ঘোষিত জাতশত্রুর দলে ভিড়েছেন। দলিত- রাজনৈতিক দলও চালাকির দ্বারা স্বার্থ সিদ্ধি করতে গিয়ে সমাজের বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে ।  দলিত আন্দোলনের ব্যর্থতা বা সীমাবদ্ধতার কারণে বা দলিত ও মুসলিম সমাজের ঐক্যের অভাবে সংঘপরিবার দলিত সমাজের বৃহত্তর অংশকে বিশেষকরে যেখানে দলিত আন্দোলন শক্তিশালী নয় মুসলিম বিরোধী দাঙ্গা বা মুসলিম গণহত্যায় ব্যবহার করছে। আজকে গোটা দেশে সংঘপরিবারের লেঠেল বাহিনির উল্লেখযোগ্য অংশ দলিত সমাজ থেকে আসা। আজকে যারা বিজেপি বিরোধী যুদ্ধে সামিল তাদের কারোরই কোন কর্মসুচি নেই সংঘপরিবারের  প্রশিক্ষিত আধা সামরিক বাহিনীকে প্রতিরোধ করার। ধরুন, আগামি লোকসভা নির্বাচনে আমাদের রাজ্য পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি একটিও আসন পেল না এবং বিধানসভা নির্বাচনেও কোন আসন পেল না তা হলে কি রাজ্যে বর্তমানে চালু অস্ত্র প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলি বন্ধ হয়ে যাবে? বেআইনি অস্ত্রগুলি কি আপনাআপনি নিরবে বঙ্গোপসাগরে গিয়ে নিস্ক্রিয় হয়ে যাবে ? যদি তা  না হয় তা হলে অস্ত্রগুলি কি রাজ্যবাসির জন্য সব সময় আশংকার কারণ হয়ে থাকছে না ?

আমাদের বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াই করতে হবে মতাদর্শগত ভাবে। রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভাবে। গণআন্দোলন ও গণ প্রতিরোধ এর মাধ্যমে।