হিন্দুত্বঃ কর্পোরেট রাজনীতি একটি ভাষ্য

ধীরাজ সেনগুপ্ত

‘ফ্যাসিবাদের উত্থান’ বা ‘অঘোষিত জরুরী অবস্থা’ এই শব্দগুলি ক্রমশ আগামী দিনে দেশের সংগ্রামটাকে একটা ছকে বেঁধে দেবে। মানবাধিকার একটা ভূমিকা থাকবে তাতে সন্দেহ নেই। কী ভূমিকা? সেটাই বড় প্রশ্ন। বর্তমান পরিস্থিতি হিন্দু পুঁজিপতি ও ভুস্বামীদের সব ক্ষমতা কুক্ষিগত করার এবং সেই ক্ষমতাকে একটা নতুন সংবিধানের কাঠামোতে বেঁধে ফেলার দেশব্যাপী ‘উদ্যোগ’-এর বৈশিষ্ট্য বহন করছে। এটায় দেশের নাগরিক জীবনের সামনে বড় বহুমূখী চ্যালেঞ্জ। এটাকেই মোকাবিলা করতে হবে। তবে সেই মোকাবিলার ফল কী দাঁড়াবে তা অজানা এবং সেই কারণেই সকলে উদ্বিগ্ন।

রাজনীতিতে ‘সম্ভাবনার’ বহু দিক খোলা থাকে। সেজন্য কেউ তাকে ‘আর্ট অফ পসিবিলিটিস’ বলে থাকেন। মানবাধিকার আন্দোলনে সম্ভাবনা একটাইঃ যাই ঘোটুক মানবাধিকারকে সুরক্ষা দিতে হবে।

ফ্যাসিবাদের বহু ধারণার মধ্যে একটি হল, এটি একটা নেতৃত্বের এবং তার গণপ্রভাব বিস্তার করার ধরণ। এভাবেই ‘মোদী সরকার’ নিজেকে হাজির করেছে এবং করে যাবে। কারণ ‘মোদীর’ বা ‘হিন্দুত্বের’ উত্থান একেবারে কাঠামোগত। কেন? সেটার খোঁজ থাকার দরকার; অন্যথায় সবকিছুই ‘রাজনীতি সর্বস্ব’ হয়ে উঠার বিপদ আছে। ‘রাজনীতি হয়ে ওঠা’ মানে ‘ঘটনা’ নিয়ে মাথা ব্যথা- ‘ঘটনা’র মাঠে হাওয়া খাওয়া! বিপরীতে আমরা কাঠামোগত দিকটির দিকে নজর দেব কারণ সেটাই মানবাধিকার-এর দৃষ্টিকোণ থেকে প্রধান বিচার্য।

একটা ভয়াবহ অর্থনৈতিক অসাম্য মোদী সরকারের শাসনের ভিত্তি। বিগত কয়েক দশকে তা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। সর্বোচ্চ ধনী এক শতাংশ ৫৮.৪ শতাংশ সম্পদের মালিক। অথবা সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ৮০.৭ শতাংশের অধিকারী। অর্থাৎ ৯০ শতাংশ নাগরিক মাত্র ২০ শতাংশ সম্পদ অবলম্বন করে দিনাতিপাত করছে। ফলে, মারামারি, কাটাকাটি, সংঘর্ষ ব্যাতীত বেঁচে থাকাই কঠিন। এই ভয়ঙ্কার দ্বন্দ্ব- দীর্ণ সমাজ অসাম্য রক্ষারই হাতিয়ার হয়েছে এবং রাজনীতিকে বহুধা বিভক্ত করে রাখছে! নাগরিকদের ধর্ম -ভাষা- লিঙ্গ – জাত-পাত – ব্যক্তি পরিচয় সবকিছুকেই গ্রাস করেছে এই অসাম্য -জনিত সর্বব্যাপী দ্বন্দ্ব। দারিদ্রসীমা নিয়ে বিতর্ক যাই চলুক দেশের ৯০ শতাংশ মানুষের সংসার অনটনে চক্রান্ত – প্রতিযোগিতায় দিশেহারা। ধনী কর্পোরেটদের ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য একটা জরুরী এবং উস্কে রাখার ফন্দি-ফিকির খোঁজা তাদের রাজনীতির মর্মবস্তু যেখানে অসাম্য জনিত মানবাধিকার ইস্যু ও ভাবনা-চিন্তা মাটিতে গড়াগড়ি খায়।

অসাম্যের বিরুদ্ধে নাগরিক সংগ্রাম, আন্দোলন ও প্রতিবাদ অসাম্যের দিকগুলিকে যতবেশী সামনে আনে ততই ঐতিহাসিক সামাজিক বিভাজন গুলিকে সামনে আনতে উঠেপড়ে লাগে শাসনের রাজনীতি যেগুলি অধিক মাত্রায় কর্পোরেট দুনিয়ার ক্ষমতার সঙ্গে জড়িত।

রাজনৈতিক কৌশলগত দিক থেকে বিচার করলে দেখা যাবে সামাজিক অসাম্য বিভেদ জনিত বিসয়গুলি  কর্পোরেট কাঠামোর ভিতরে টেনে আনা সম্ভব এবং একান্তে নেতৃত্ব যোগাচ্ছে ডব্লুবি- আইএমএফ- ডব্লুটিও-র বিশ্বজনীন নিয়ন্ত্রণ এবং তাদের ‘আবিষ্কৃত’ কিছু কিছু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচী যার প্রচার যতটা রাজনৈতিক সুবিধা দেয় ততটা ‘খরচ’ লাগে না। এটা একটা  cost effective পদ্ধতি। ভোট জোগাড়ে এই পদ্ধতি কাজে লাগলেও অর্থনৈতিক অসাম্য দূর করার ক্ষেত্রে কোনও প্রভাব ফেলে না। পদ্ধতিটা মতাদর্শহীন, বিবেকশূন্য ও সুবিধালোভী রাজনৈতিক দলগুলি ও এনজিও গুলির (ফান্ডেড) কাছেও আকর্ষণীয় বিকল্প। সাম্যের দাবীকে হারিয়ে দিতে এর জুড়ি নেই। এটা এখানে জানানো দরকার যে ন্যাশনাল মিনিমাম সিকিরিউটি প্যাকেজ নিয়ে একটা আইন করার পরামর্শ দিয়েছিল ২০০৪ সালে ইউপিএ সরকার গঠিত ‘National Commission for Enterprises in the Unorganised section’। সেটা ইউপিএ সরকারই বাতিল করেছিল। আরও বলা দরকার যে জিডিপি-র ১.৪ শতাংশ মাত্র সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় হয় ভারতে যা চীন, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, এমনকি নেপালের থেকেও কম। মানবাধিকার আন্দোলন বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে দাবী জানাতে পারে ২৫-৪০ শতাংশ ব্যয়ের, যা বর্তমান কর্পোরেট পরিপোষিত রাজনৈতিক দলগুলির কাছে কল্পনারও অতীত! ‘সুরক্ষা ও উত্তরণ’ ( অমর্ত্য সেন দ্বেজ এর ব্যবহিত শব্দভাণ্ডার )-এর জন্য আজকে ওই দাবী স্বাভাবিক । কিন্তু বাস্তব এর বিপরীত – খুব অল্প লোকই ‘সুরক্ষা’র নামে কিছু পায় আর ‘উত্তরণের’ জন্য ব্যয় কমানো হচ্ছে!

অর্থনৈতিক কাঠামো ছাড়াও একটা ভঙ্গুর ও প্রাচীন সামাজিক কাঠামোর মধ্যে ভারতের জীবনচর্চা বয়ে চলেছে। মানুষে-মানুষে সম্পর্কের বিবর্তন সেই সামাজিক কাঠামোর ও জীবনবোধের পরিপন্থী হয়ে উঠেছে, ধর্ম, জাত-পাত কি ভাষা ইত্যাদি বিবেচনা না করলে আর চলে না। বরং শিক্ষা কর্মদক্ষতা ও অন্যান্য যোগ্যতা মানুষের প্রকৃত পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছে। অর্থনৈতিক অসাম্য এমন  মাত্রায় উপরে উঠে গিয়েছে যে ওই সব গুনাবলীকে রাষ্ট্র আর তেমন কদর করে না। ‘ Inclusive Development-এর ধারণা থেকে রাষ্ট্রকে বাস্তব ও ব্যবহারিক ক্ষেত্রে সরে যেতে হচ্ছে। রাষ্ট্র মানুষের ( ভারতীয়দের) গুনাবলীকে ব্যবহার করতে ব্যর্থ হচ্ছে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ওই গুণাবলীকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। উল্লেখ করা দরকার যে শিল্প ক্ষেত্রে কলকারখানা ব্যাপকহারে বন্ধ হয়ে গেলেও শ্রমিক দক্ষতাকে বাঁচিয়ে রাখার কোন উল্লেখযোগ্য উদ্যোগই রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কাঠামোয় জায়গা পায়নি। রাষ্ট্র ফাটকা পুঁজির বাড়বাড়ন্তকেই শুল্ক নির্ধারণের নীতি করেছে।

ভারত রাষ্ট্র ও প্রতিটি রাজ্য সরকার এটা ভালভাবেই জানে যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্য ( সঙ্গে বিপর্যয় পর্ব) বিরুদ্ধে জাগরিত জনমতকে ‘ফাটকা পুঁজি’র বিকাশ ঘটিয়ে স্তব্দ অসম্ভব। চাই সামাজিক বিভাজন ও দ্বন্দ্ব তৈরির কৌশল। জাত-পাত নিয়ে পরীক্ষা হয়েছে, তাতে জাতীয় দলগুলির প্রভাব কমেছে। বেড়েছে আঞ্চলিক দলগুলির দাপট। ‘কোয়ালিশন পলিটিক্স’-এর রমরমা যা ‘ইউনিটারি’ ভারত গড়ার স্বপ্নের পক্ষে ক্ষতিকর বলে মনে করা হয়। যেহেতু ‘ভারতের ঐক্য ও অখন্ডতা’ ও ‘ফেডারেলিজম’-এর শক্তিকে পরস্পর পরিপন্থী ভাবনাই সংবিধানে জায়গা পেয়েছে। তবে, দেখা যাচ্ছে এই ভাবনা ভারতের অভ্যন্তরীণ সামাজিক অবস্থার সঙ্গে মিলছে না; সংঘাত তৈরি করছে সমাধানের বদলে , একটা যেন সামগ্রিক রাষ্ট্র -এর দিকে যাত্রা চলছে। বিশদে এসবই মানবাধিকার আন্দোলনের বৃহত্তর পরিধির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিষয় এবং মানবাধিকার সুরক্ষা ও প্রতিষ্ঠাকে আঘাত করে।

জাত-পাত নিয়ে দ্বন্দ্ব জিইয়ে রাখা বা জ্বালিয়ে রাখার পরীক্ষা ততটা সফল নয়। এখন ভাবনা সবচেয়ে বেশী সুযোগ দিয়েছে হিন্দুত্ববাদীদের (আর এস এস পরিবারকে) এরকম সন্ধানে তারা দীর্ঘ ব্যয় করেছে। কর্পোরেট দুনিয়ারও এমন একটা রাজনৈতিক শক্তি ভারসাম্য দরকার যা ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্যের বিরুদ্ধে জাগরিত জনমতকে ( বহু রূপে পরিব্যক্ত) সামলাতে পারে। তাই তাদের কাছেও ‘হিন্দুত্ব’ একটা সাময়িক ‘বিকল্প’। ‘সাময়িক’ কারণ ‘হিন্দুত্ব’-এর উচ্ছৃঙ্খলতা আন্তর্জাতিক মহলে কৈফিয়তের কারণ হচ্ছে এবং এই  উচ্ছৃঙ্খলতা বিজেপি- আরএসএস-র নিয়ন্ত্রকদের হাতের বাইরে। ইতিমধ্যে দাবি উঠেছে সাম্প্রদায়িকতা রোধে আইন হক। এ সংক্রান্ত ২০০৫ সালে বা ২০১১ সালে দুটি বিলই ক্রুটিতে ভরপুর। বিল দুদিকেই ভরপুর না করে বাতিল করা হয়েছে। ইচ্ছাকৃতভাবেই এমন ক্রুটিসম্বলিত আইনের খসড়া তৈরি করা হয় যাতে তা আর না করতে হয়।

হিন্দুত্ব’র সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হল কাঠামো শূন্য হিন্দু ধর্মের বহুমুখী চর্চাকে একটা কাঠামোতে বেঁধে নেওয়া যা ধর্মীয় দিকে অসম্ভব কিন্তু ‘রাজনৈতিক ধর্মীয়’ আক্রমণের একটা হাতিয়ার বলেই ধরা হয়। রাজনীতির জন্য হিন্দুত্ব যতটা ফলদায়ী, হিন্দু ধর্মের জন্য তা নয়। ধর্মটায় আক্রমণের মুখে পড়েছে- তার সহনশীলতার দৃষ্টিভঙ্গি বা দর্শনটায় হারিয়ে যাচ্ছে। ধর্মকে রাজনীতির আঙ্গিনায় আনলে এমনটাই ঘটে। ইসলাম বা খ্রিষ্টান ধর্মের খেত্রেও এটা সমান ভাবে ঘটেছে ও ঘটছে। ‘War agnainst Islam’ মার্কিনদের এই নীতি খ্রিষ্টানদের প্রতি মানুষকে সন্দিহান করে তুলেছে। ট্রাম্প ও মোদীকে এক পাল্লাতেই মাপা হচ্ছে এবং হবে।

 কাঠামো দিক থেকে বিচার করলে ‘হিন্দুত্ব’ ভারতীয় সংবিধানকে উপড়ে ফেলতে বদ্ধপরিকর গোলওয়ালকারের ‘Bunch of thoughts’ অন্যান্য লেখা সেই সিদ্ধান্তই দেয়। জাতীয় ফ্ল্যাগ চলবে না। ট্র্যাডিশনাল হিন্দু ফ্ল্যাগ চাই, হিন্দিকে জাতীয় ভাষা করতে হবে। মুসলিম মানুষের বসবাসের অঞ্চল গুলি আসলে ছোটখাট পাকিস্তান। সংবিধানে ভারতীয় বলে কিছু নেই। মুসলিম, খ্রিষ্টান ও কমিউনিস্টরা প্রধান ‘অভ্যন্তরীণ বিপদ’; শুধু হিন্দুরাই জাতি গঠন করবে এবং জাতির গঠন সেভাবেই সুরক্ষিত ও পোক্ত হবে; ‘ফেডারেল’ সরকার বিচ্ছিন্নতা বোধ আনে, দরকার ‘ইউনিটারি’ ব্যবস্থা ইত্যাদি।

গোলওয়ালকারের ধারণাভঙ্গীর আজকের ব্যবহারিক রূপটা নজর করা দরকার। এই মুহূর্তে তার ধারণা এই রকম -১) অযোধ্যায় রামমন্দির , ২) ইউসিসি (সিভিল কোড) , ৩) সংবিধানের ৩৭০ নং ধারা বাতিল, ৪) গো-হত্যা বন্ধ (সংবিধানের ৪০নং ধারা), ৫) পার্সোনাল ল বাতিল, ৬) বিচারপতি নিয়োগের ব্যবস্থার পরিবর্তন, ৭) কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে মূর্তি স্থাপন, ৮) দাঙ্গা ছড়ানো, ৯) শিক্ষা- সংস্কৃতি গেরুয়াকরণ (‘পদ্মাবতী’ একটি উদাহরণ নয় , একটা নীতি), ১০) কাশ্মীরের ঘটনাবলী, ১১) পাকিস্তান-ভারত সম্পর্ক, ১২) জঙ্গি হামলায় শুধু মুসলিম খোঁজা, ১৩) অন্যান্য।

সংবিধানের ভিতরে বা বাইরে থাকা সব ইস্যুকেই এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যে তা ‘হিন্দুত্বের এজেন্ডা’ সামনে আনে। ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বৈষম্য ও বঞ্চনা , বেহাল কৃষি অর্থনীতি, কর্মচ্যুতি,বেকারত্ব, দুর্নীতি দৈনন্দিন জীবনের ইত্যাদি সমস্যাগুলি পিছনের সারিতে চলে যায় বা আপাঙক্তেয় হয়ে যায়। এতে সাময়িক সুবিধা হবে রাজনীতির , প্রাধান্যও জুটতে পারে। কিন্তু জীবনযন্ত্রণা প্রচার যন্ত্রকে ( প্রচার কৌশল কে) হার মানাবে। এখনই তার কিছু লক্ষণ স্পষ্ট।

কর্পোরেট পুঁজির জন্য কাজ করতে গিয়ে এনডিএ-র বর্তমান সরকারকেও মানবাধিকারের রীতিনীতিকে জলাঞ্জলি দিতে হচ্ছে। সাধারণ ফৌজদারি আইনের জায়গায় অমানবিক (কালা) আইনের বেড়াজাল তৈরি করছে। সংবিধানের ক্রুটিকে (২২ ধারা) বা অগণতান্ত্রিক দিকগুলিকে ব্যবহার করে।কিন্তু সংবিধানের ‘নিরদেশাত্মক’ নীতি গুলিকে ব্যবহার করে। তারা মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার এক সূত্রে বাঁধার বদলে তারা সেগুলিকে টুকরো টুকরো করে দিয়েছে। ‘গণতন্ত্র’-র অর্থ দাঁড় করিয়েছে ‘ভোট সর্বস্বতা’ আইনের শাসনকে বানিয়েছে বহু বিপরীতধর্মী আইনের সমাহার ও সহাবস্তান এবং মানবাধিকারকে কর্পোরেটের নিচে পাঠিয়েছে। ‘রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস’ রাষ্ট্রীয় নীতি হয়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের নাম কলুষিত হয়েছে ( ইউ পি আর – ২০০৮, ২০১২, এবং ২০১৭ মে-তে)।

 আজকের যন্ত্রণা আগামীকালের নতুন ‘ মানবিক ভারত’ কে নির্মাণ করে চলেছে। সব কিছুর মধ্যে সেটাই সবচেয়ে গুরুপ্তপূর্ণ। সব দিক থেকে প্রশ্ন উঠছে; এমনকি প্রশ্ন উঠছে যে ভ্রাতৃহরি ও পতঞ্জলি সকলের জন্য শিক্ষা বা শিক্ষা না থাকলে মানুষ পশুত্ব লাভ করে ইত্যাদি বললেও মোদীজির সরকার শিক্ষা খাতে ব্যয় কমাচ্ছে কেন? আটক ব্যক্তির অধিকার রক্ষার বিধান নিয়ে কৌটিল্যের মত গ্রাহ্যতা পাচ্ছে না কেন? কাত্যায়নী দ্রুত ও ন্যায়বিচার , বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা ও রাজ কর্মচারীদের ঘুষ না নেওয়ার যে বিধান দিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় নীতি তাকে স্বাধীনতার ৭০ বছর পরও কেন লাগু করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ‘মনুস্মিতি’র ৫০ টির মতো ভিন্ন ভিন্ন সংস্কার আছে; কোনটাকে হিন্দুত্ববাদীরা দেশের সংবিধান বানাতে চায়? কোন পতাকাটি প্রকৃত ‘হিন্দু পতাকা’? গো-মাংস গ-মাংস কি হিন্দু ধর্মে অচ্ছুৎ? মেয়েরা চাকরি পাচ্ছে বলেই কি পুরুষরা বেকার থাকচ্ছে? হিন্দু বিধবাবারা কি ন্যায় বিচার পায়? সব হিদু রাজারাই কি প্রজাবৎসল ছিলেন? মধ্যযুগের তুলনায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগে কি হিন্দুরা কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? এরকম বহু প্রচ্ছন্দ হিন্দুত্বের রাজনীতির সামনে যার বস্তুনিষ্ঠ উত্তর তারা এড়িয়ে যাচ্ছে।

ভারতীয় অর্থনীতির কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজনীয়তা হয়ে পড়েছে। মূল সংস্কার দরকার সমাজ জীবনকে বঞ্চনা ও অসাম্যমুক্ত করার ( যতটা বেশী সমভব)জন্য। এই কাঠামোর কিছু উপর উপর সংস্কার যেমন বিমুদ্রাকরণ, জিএসটি ইত্যাদিকে মোদী সরকার অস্ত্র করেছে। অর্থনীতির মৌলিক সংস্কারের প্রয়োজনীয়তাকেই এভাবে পাশ কাটাতে চাইছে। তবে, এগুলি সমাজকেই আক্রমণ করেছে; বিক্ষোভ, অসন্তোষকে বাড়িয়ে দিয়েছে। ‘উন্নয়ন এক আগ্রাসী চরিত্র নিয়েছে। হিন্দু অস্মিতাকে কাজে লাগিয়ে তাকে প্রশমিত করার চেষ্টা চলছে। রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও হিন্দত্ববাসি সামাজিক সন্ত্রাস কর্পোরেট পুঁজির স্বার্থে জোট বেঁধে ভারতকে অবদমিত করার চেষ্টা চলছে।

 রাষ্ট্রীয় সামাজিক সন্ত্রাসের আক্রমণ রুখতে ভারতের মানুষের (নাগরিকদের) কাছে সর্বজন গ্রাহ্য ও সর্বজনীন মানবাধিকার রক্ষার ঐক্য বদ্ধ আয়োজনে সাড়া দেওয়া ছাড়া আর অন্য পথ নেই। মানবাধিকার রক্ষার প্রাধান্যও নিশ্চয়তা দিতে সক্ষম এমন রাজনৈতিক বিন্যাস মাথা উঁচু করতে চাইছে।

মানবাধিকার সর্বজনীন দাবিসূমহকে এক জোট করলে ব্যক্তি- গোষ্ঠী – সমষ্টি এক মঞ্চে বা এক উদ্যোগে দাঁড়াতে সক্ষম হবে। রাজনীতি এর সমাধান নয় এখন। বরং তা অনুষঙ্গ হলে দেশের রাজনৈতিক ও ঐক্য এতে দেশের অখণ্ডতা প্রকৃত অর্থেই রক্ষা পাবে। কর্পোরেট ও রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস , হিন্দুত্ব, সামাজিক সন্ত্রাস দেশের ঐক্য, অখণ্ডতা ও নিরাপত্তার পক্ষে সবচেয়ে বড় বিপদ এখন। সঙ্গে জুড়ে নেওয়া ভাল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গুলির অভ্যন্তরীণ দুর্দশা এবং সেখানে বৈদেশিক ষড়যন্ত্রের লুক্কায়িত বীজ।

দাঙ্গা ও সামাজিক পরিবেশে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি করা ছাড়া বিজেপি- আর এস এস সরকারের লক্ষ ছিল সংবিধানকে মুচড়ে দেওয়া – যতটা পারা যায়। বর্তমান সংবিধান আজ ৬৭ বছরের অভিঞ্জতার নিরিখে পুনরমুল্যায়নের মধ্যে । তবে পশ্চাদগামিতার জন্য নয়; জমে উঠা সমস্যা গুলির মীমাংসার জন্য সেটা আরও বিশারদদের কাজ নয় শুধু। সমগ্র দেশবাসীর কাজ, মানবাধিকার সুরক্ষার কাজ।