প্রসঙ্গ ডিম্ভাতঃ ডিম আমার বরাবরই প্রিয়

প্রসঙ্গ ডিম্ভাতঃ ডিম আমার বরাবরই প্রিয়

~শাহনওয়াজ আলি রাইহান

ডিম আমার বরাবরই প্রিয়। পার্টি-পলিটিক্স নির্বিশেষে নেতা-নেত্রীদের বক্তব্য শুনতেও দারুন লাগে। জ্ঞান হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক বক্তব্য শুনতে বরাবরই আগ্রহ বোধ করতাম। একটা লোক, অথচ ক্লাসের মাস্টারমশাইদের মত নিদির্ষ্ট একটা টপিক নয়, বরং তাঁদেরই মত করে অর্থনীতি, বিদেশনীতি, ধর্মনিরপেক্ষতা , কৃষি, দ্রব্যমূল্য, পেট্রোল কতকি নিয়ে বলছে ! ঠিক ভুল বিচার করার বয়স সেটা ছিল না , ছিল বিস্ময়ের। এই বিস্ময়ই গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখে, এটাই পরে ঠিক-ভুল বিচারের বোধ তৈরি করে। তাই তো গণতন্ত্র কাউকে অমরত্ব দেয়না। মাথায় তুলে, আবার আছাড়ও মারে । ব্রিগেড থেকে তিনশ দশ কিলোমিটার উত্তরের আমাদের শৈশবে তাই অনেক টুকরো টুকরো ব্রিগেড আছে , আজও স্মৃতির ফ্লাশব্যাকে ভেসে উঠে — বয়সের ভারে চেয়ারে বসেই গনি খান বলছেন ‘ আমি মরে গেলে তোরা মাটি দিস না দিস, এবার ভোটটা দিবি তো ?’, প্রাজ্ঞ শিক্ষকের মত জ্যোতি বসু বোঝাচ্ছেন কেন্দ্রের পুঁজিবাদী নীতি কেন জনগণের জন্য মারাত্মক, তপন শিকদার, সূর্য মিশ্র, সর্দার আমজাদ, শৈলেন সরকার, দাসমুন্সী আরো অনেকেই বলছেন আর আমরা শুনছি। বিদ্যুত-দুরদর্শন-সংবাদপত্রবিহীন আমাদের গ্রামের বাড়ির ছাদে, চায়ের দোকানে ভোটের সময় কালো রঙের ফিলিপ্স রেডিওতে বিবিসি লন্ডন বাংলা সার্ভিসের সন্ধ্যার খবর হচ্ছে ফুল ভলিউমে আর জনা বিশ-ত্রিশেক লোক সেটা আগ্রহ ভরে শুনছেন , পাশের ছোট শহরে সাইকেল চালিয়ে টিভিতে রাজীব গান্ধীর শেষকৃত্য দেখতে যাচ্ছেন , আবার সেখান থেকে কেউ একটা ‘বর্তমান’ কিনে আনলে আমার দাদা ( বাবার বাবা) গোগ্রাসে ‘রাজ্যের রাজনীতি’ কলমটা পড়ছেন – এগুলো সবই আজও মনে হয় কালকের ঘটনা।

আজও বাংলার গ্রামগুলোতে একই অবস্থা। হয়তো বিদ্যুতায়নের জন্য ঘরে ঘরে টিভি এসেছে, মোবাইল টিপলে কাগজ পড়া যায় বলে সেই দলবেঁধে খবর শোনার উন্মাদনাটা নেই । কিন্তু তারপরও শহুরে কলকাতার চেয়ে গ্রাম বাংলার জনগণের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে আগ্রহ, কোনও নেতা-নেত্রীর ভাল একটা বক্তব্য শোনার প্রবণতা, একটা ভাল রাজনৈতিক লেখা পড়ার বাসনা কোনও অংশেই কম না । কলকাতার দৈনিক কাগজগুলোর সম্পাদক সমীপেষু বা ‘দেশ’ পত্রিকার পাঠকের চিঠিগুলো আজও মফস্বলেরই বেশী । কলকাতায় একটা কফি হাউস আছে , সেটা নিয়ে নস্টালজিয়ার শেষ নাই ! কিন্তু আমাদের সারা বাংলাজুড়ে গ্রামগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হাজার হাজার ‘কফি হাউস’। রিগিং-বুথ ক্যাপচারিং-ছাপ্পার পর শেষ পাতে যতটুকু গণতন্ত্র পড়ে থাকে, সেটার চাষ-আবাদও এই চায়ের দোকানগুলোতেই হয় । এঁরা কেউ এমএলএ-এমপি-মন্ত্রী না, একটা মিছিলে হেঁটে দশটা ফটো আপলোড করা যদু-প্রেসি-আলিমুদ্দিন-কালীঘাট-বিধান ভবন লেভেলের নেতাও না। এঁরা বাংলার সেই নাম না জানা আপামর জনগণ যাঁরা মাছ-ফুটবল-নৌকা বাইচ-গম্ভীরা-যাত্রাপালা-রথের মেলার মতো রাজনীতি বিষয়টাকেও প্রাণ দিয়ে ভালবাসেন। এই প্রাথমিক ভালবাসাই পরে সঞ্চারিত হয় কোনও নিৰ্দিষ্ট নেতা-নেত্রী বা পার্টির দিকে। তাই একটা ত্রিপল বা নলকূপ পাওয়ার বাসনা বা ক্ষমতাসীন দলের ভয়ে মিছিলে যাওয়া যেমন কারো কারো জন্য সত্য, তেমনি কিছু পাওয়ার আশা ব্যতিরেকে বা কোনও নিগ্রহের আশঙ্কা ছাড়াই নেহাতই রাজনীতি বিষয়টার প্রতি আগ্রহবোধ করে লাখ লাখ মানুষ শত শত কিলোমিটার দূর থেকে ব্রিগেডে বক্তব্য শুনতে যাবে – এটাও সত্য । এতে বিস্ময়ের কিছুই নাই।

বিস্মিত তারাই হচ্ছে যারা অনেক আগেই জনবিছিন্ন হয়ে পড়েছে। জনগণ থেকে কাটতে কাটতে দিনরাত ফেসবুকের খিল্লি -খোঁচা রাজনীতিতে গিয়ে শ্যাওলার মত আটকে গেছে। গঠনমূলক সমালোচনার পরিশ্রমের পথ ত্যাগ করে অনেক আগেই যারা দু’লাইনে পোস্ট দেয়া চুটকি পলিটিক্সের অলস পথে নেমেছে। নিজ শহর আর ফ্রেন্ডলিস্টের বাইরে যারা গ্রাম-বাংলার মানুষের মন-মানসিকতা-রুচি বুঝতে অপরাগ – তারাই এই ‘ডিম্ভাত’-এর খিল্লি করছে। মানুষকে ক্ষুধা-অন্ন-পেটের খোঁচা দেয়া যে কত বড় নোংরা রুচির পরিচয় এটা যদি এরা বুঝত ! ভাবলে হাসি লাগে – এই কিছুদিন আগেও এরা নিজ নেতার সেই বিখ্যাত কথাটা , যেটা সত্য এবং খাঁটিও, প্রায় বলত – ‘মানুষই ইতিহাস রচনা করে ‘ ! এইসব আবালদের এড়িয়ে চলুন, আর বাড়ির বাড়ন্ত বাচ্চাদের বেশী বেশী করে ডিম খাওয়ান। কারণ ডিম শুধু একটা সস্তায় সুস্বাদু খাবারই নয়, জীবনবিজ্ঞানের সুষম খাদ্যও । গরীব সাব-অলটার্নদের জন্য ‘দেখ আমি বাড়ছি মাম্মি ‘ পুঁজিবাদের সুষম বিকল্পও !

(লেখকঃ বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণারত স্কলার। লিখেছেন বইও। লেখাটি ফেসবুক থেকে অনুমতি সহকারে এখানে প্রকাশ করা হল। লেখকের নামের উপরে ক্লিক করে লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন। )