~ লি ট ন রা কি ব

আমরা স্বপ্ন দেখি দেখতেই থাকি আমাদের স্বপ্নে সহসা বৃষ্টির সৃষ্টি থাকে না, কতক মেঘে ঝড় থাকে আবার কতক মেঘ থাকে শুষ্ক, শুধুই বাস্পেভরা সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মতো মেঘ। তারা উড়ে উড়ে দূরে চলে যায় স্থিতি পায় না। সেইসব সাদা মেঘেরা নিজ থেকে কাল্পনিক ছবি হয়ে ভেসে থাকে ভেসে বেড়ায় মেঘের উপর মেঘ উড়ে যায় স্বপ্ন আঁকা তাতে… কিন্তু আজ যেন সব কেমন ছন্নছাড়া! আমাদের স্বপ্নগুলো যেন গিলে গিলে খেতে চায় এমনকি আমাদের ভবিষ্যৎও।
ডিসেম্বরের শুরু থেকে বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হয় নতুন আতঙ্ক নভেল করোনা ভাইরাস। ডিসেম্বরের শেষ দিকে চীনসহ বিশ্ববাসীকে এক নতুন ভাইরাসের সতর্কবার্তা দেন লি ওয়েনলিয়াং নামের এক চীনা চিকিৎসা। চীন সরকার এই সতর্কবার্তাকেই একেবারেই আমল দেয়নি বরং গুজব হিসাবে উড়িয়ে দিয়েছিল।
ডাক্তার লী’র সেই বার্তার সত্যতা মাত্র একদিন যেতে না যেতেই টের পেতে থাকে চীনের জনবহুল উহান শহরের মানুষ। মাত্র তিন মাসের মধ্যেই প্রায় হাজার হাজার মানুষ শুধু চীনেই আক্রান্ত প্রাণঘাতী এই ভাইরাসের। অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় মানুষ থেকেই মানুষের মধ্যে সহজেই ছড়িয়ে পড়ছে। প্রাণঘাতী এই ভাইরাসটি। চীনের সীমান্ত পেরিয়ে এরইমধ্যে পৃথিবীর ২০২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে মাত্র তিন মাসের মধ্যেই। করোনা ভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। প্রতিদিনই নতুন করে কোরোনা ভাইরাসে আক্রান্তের খবর আসছে সারা বিশ্ব জুড়ে, ভারত ও তার ব্যতিক্রম নয়। সারা বিশ্বে এই ভাইরাসে আক্রান্ত লক্ষাধিক মানুষ। সবচেয়ে বেদনাদায়ক প্রায় ৫০হাজার জন মারা গিয়েছেন পৃথিবীজুড়েই। সবচেয়ে ভয়ংকর অবস্থা ইতালিতে সেখানে ১২০০০ জন মৃত । পৃথিবীর অন্ধকারময় সময়। আগুনের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরাও! অপ্রতুল কিট অপর্যাপ্ত ল্যাব, জীবন-জীবিকা বিপদের মুখে, চারিদিকে হতাশা। আমাদের দেশে ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে আক্রান্ত আরো দুই হাজার । আজ আমরা যে পৃথিবীর সম্মুখীন হয়েছি তা অজানা আমাদের সরকার সংক্রমনের মোকাবিলায় লকডাউন এর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন টানা ২১ দিনের জন্য সরকারের এই সিদ্ধান্তে সবাই সমর্থন জানিয়েছে আমরা ভালোবেসে এক হতে পারিনি ঠিকই কিন্তু মৃত্যুভয়ে কোথাও যেন এক হয়ে গেলাম মানব সভ্যতার চূড়ান্ত বিপর্যয়ের এই সময়ে।
চিনের কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে করোনাভাইরাস এর কারণেই সেখানে অসুস্থতা বা মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটছে। ভাইরাসটির আরেক নাম 2019-এনসিওঅভি।
এটি এক ধরনের করোনা ভাইরাস। কোরনাভাইরাসের অনেক রকম প্রজাতি আছে কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৬ টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। তবে নতুন ধরনের ভাইরাসের কারণে সেই সংখ্যা এখন সাত। ২০০২ সাল থেকে চীনের মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া সাস’ (সিভিয়ার এ্যাকিউট রেস্পিরেটরি সিনদ্রোম)নামের ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৭৭৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল আর ৮০৯৮ সংক্রামিত হয়েছিল সেটিও ছিল এক ধরনের করোনাভাইরাস। সাসে’র ভয়াবহ অভিজ্ঞতা এখনও ভুলতে পারিনি বিশ্ববাসী ;ইতিমধ্যেই সামনে নতুন আর এক আতঙ্ক।
জ্বর দিয়ে এই ভাইরাসের সংক্রমণ শুরু হয় এরপর শুকনো কাশি দেখা দিতে পারে প্রায় এক সপ্তাহ পরে শ্বাসকষ্ট শুরু হতে পারে। অনেক রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করে চিকিৎসা দিতে হয় প্রতি চারজনের মধ্যে অন্তত একজনের অবস্থা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায় এবং আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে হালকা ঠান্ডা লাগা থেকে শুরু করে মৃত্যুর সব উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ থেকে মৃত্যু পর্যন্ত খানিকটা সময় লাগে ফলে আরও অনেক রোগী মারা যাওয়ার আশঙ্কা যেমন রয়েছে তেমনি একজনের থেকে একাধিক মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার ভয়ও আছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হল রোগে আক্রান্ত হয়েছে কিন্তু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়নি এমন রোগীদের সংখ্যা আসলে কত সেই তথ্য কারো জানা নেই কারণ প্রথম বেশ কয়েকদিন বোঝাই যায়না আক্রান্ত কিনা। কোরনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যারা মারা গেছেন তাদের অধিকাংশের বয়স ষাটের ঊর্ধ্বে বয়স্ক মানুষদের ইমিউনিটি পাওয়ার অনেক কম থাকায় এর শিকার হচ্ছেন তারাই। শিশুদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও অনেক বিশেষজ্ঞরা অনুমান করছেন যে শিশুদের মল থেকেও নাকি এর সংক্রমনের সম্ভাবনা অনেক বেশি।
মৃত্যু ভয় ভীষণ নিষ্ঠুর, জীবনের থেকে প্রিয় আর কিছুই নেই! পৃথিবী খুব অচেনা রকমের বদলে গেল রাতারাতি আমার মত কোটি কোটি মানুষ বন্দি হয়ে পড়ল; শিশুরাও আটকে পড়লো । হাজার অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও আমরা এক হয়ে গেলাম কভিড১৯ এর বিরুদ্ধে। ঘুম নেই খাওয়া নেই স্বাস্থ্যকর্মীদের তারা অক্লান্ত ভাবে ১৮ঘণ্টা ধরে পরিশ্রম করে চলেছেন।
এই রোগ থেকে রক্ষার একমাত্র উপায় হলো অন্যদের মধ্যে ভাইরাসের সংক্রমন হতে না দেওয়া। এরই মাঝে অবশ্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, যে কোরনা ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার হতে দেড় বছর সময় লাগতে পারে। আপাতত সচেতনভাবে নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই করার নেই বিশ্ববাসীর। সচেতনতা এবং সর্তকতা একমাত্র আমাদের পথ এই মুহূর্তে আর সে কারণেই আমাদের সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা এবং মেনে চলা আমাদের প্রধান দায়িত্ব কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। শুধু পুলিশ দিয়ে সব করা যায় না, মানুষ বিধি না মানলে পুলিশ দিয়ে কিছুই হয়না। আইসোলেশন এবং কোয়ারেণ্টাইনে থাকা অত্যন্ত জরুরী এর জন্য হয়তো আমরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতে পারছি না ঠিকই কিন্তু আমাদের এই সময়ে এক হয়ে এর মোকাবিলা করতেই হবে সরকার আমাদের পাশে রয়েছেন। তীর্থক্ষেত্র গুলিও সরকারের ডাকে সাড়া দিয়েছে তারাও আর জমায়েত করছে না। রাজ্য সরকার ও কেন্দ্র সরকার সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। ইতিমধ্যে কেন্দ্র সরকার ১লক্ষ ৭০ হাজার কোটি টাকার আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন রাজ্য সরকার ২০০কোটি টাকার আর্থিক সহায়তা ঘোষণা করেছেন সেই সঙ্গে সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে খাদ্যদ্রব্য সহ পৌঁছে দিতে উদ্যোগী অতি প্রয়োজনীয় বেশ কিছু সরঞ্জাম এর মধ্যে রয়েছে সাবান, হ্যান্ডওয়াস এবং স্যানিটাইজার। আমাদের দেশে থার্ড স্টেজ এখনো কিন্তু আসেনি সে কারণে আমাদের আরও বেশি সচেতন এবং সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এবং অবশ্যই আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে হবে যাতে এই সমস্যার সমাধান আমরা বের করতে পারি। কোরনা সংক্রমণ আসলে একটা সামাজিক সমস্যা আমরা যেন এই মুহূর্তে উৎসবে মেতে না উঠি পুলিশ দিয়ে যেন আমাদের সরাতে না হয়, আমরা যেন অনেক বেশি সচেতন হয়ে উঠতে পারি বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস করি সাবান জলদিয়ে, হ্যান্ডওয়াস ব্যবহার করি সবচেয়ে ভালো হয় হ্যান্ড স্যানিটাইজার দিয়ে বারবার হাত ধোয়ার অভ্যাস করা হাঁচি কাশি হলে টিস্যু পেপারের ব্যবহার করা বা মুখ ঢেকে যাতে এর জীবানু যেন অন্যত্র ছড়িয়ে না পড়ে এবং, মাক্স ব্যবহার করা। চোখে কিংবা মুখে বারবার হাত না দেওয়া কারণ ফুসফুসের সুরক্ষা এইসময় অত্যন্ত প্রয়োজন।
একদিন সব মন খারাপ কেটে যাবে। মেঘ থেকে খড় কুটো নিয়ে, রামধনু থেকে মাটি নিয়ে, সোনালী সম্ভারে ভরে উঠবে আবার আমাদের পৃথিবী। এই কঠিন সময়ে কবির কথায় বলি-“ আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি”।