
সমৃদ্ধ দত্ত, নয়াদিল্লি: একা ভারত নয়। গোটা বিশ্ব তাকিয়ে আছে একটি বিশেষ তারিখের দিকে। ৪ নভেম্বর। আমেরিকার ট্রাম্প প্রশাসন হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে আগামী ৪ নভেম্বরের পর ইরান থেকে তেল আমদানি অথবা তেহরানের সঙ্গে কোনওরকম অশোধিত তেলের বাণিজ্যে যেসব রাষ্ট্র যুক্ত থাকবে, তাদের আর্থিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়তে হবে। ওই হুঁশিয়ারি ভারতের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। একদিকে দেশে পেট্রপণ্যের দাম সব রেকর্ড ভেঙে আকাশ স্পর্শ করেছে এবং লাগাতার দাম বেড়েই চলেছে। আবার অন্যদিকে ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম সর্বকালীন কম। এই দুয়ের ধাক্কায় ভারতের অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থনীতি চরম বেসামাল। এমতাবস্থায় আগামী ৪ নভেম্বরের পর ইরান থেকে তেল আমদানিতে আমেরিকার নিষেধাজ্ঞার সময়সীমা সমাপ্ত হওয়ায় নতুন করে পেট্রপণ্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা। যদিও ভারত এখনও মনস্থির করেনি আমেরিকার ওই হুমকি মেনে নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনকেই সন্তুষ্ট করা হবে নাকি ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক তিক্ত করার রাস্তায় হাঁটা হবে না, উল্টে আমেরিকাকেই বার্তা দেওয়া হবে ভারতের সার্বভৌম অবস্থান অক্ষুণ্ণ রাখা নিয়ে। এই দোলাচল রয়েছে এখনও। ভারত ইতিমধ্যেই আমেরিকাকে ক্রুদ্ধ করেছে রাশিয়ার থেকে এস ৪০০ মিসাইল প্রযুক্তি কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করে। কারণ আমেরিকার আর্থিক নিষেধাজ্ঞার লক্ষ্য ছিল তিন আমেরিকা বিরোধী দেশকে ঘিরে। রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়া। ভারত আমেরিকার হুমকি অগ্রাহ্য করেছে। সম্প্রতি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ভারত সফরে এসেছিলেন এবং নরেন্দ্র মোদি পুতিনের সঙ্গে ওই ৪৪ হাজার কোটি টাকার মিসাইল চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। পাশাপাশি ইরানের থেকে তেল আমদানির ক্ষেত্রেও ভারত সেপ্টেম্বর মাসেই নতুন বরাত দিয়েছে। সুতরাং ধরে নেওয়া হচ্ছে ভারত আমেরিকার চাপে সম্ভবত নতি স্বীকার করবে না। সেই প্রেক্ষাপটে অবশ্যই পেট্রপণ্যের দাম আবার আগামী মাসে বাড়তে পারে। এই সঙ্কট সামলাতে ভোটের আগে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আজ নিজেই তেল সংস্থাগুলির সঙ্গে বৈঠক করেন।

সেই বৈঠকে প্রতিটি তেল সংস্থার চেয়ারম্যান তো বটেই, প্রাকৃতিক গ্যাস ও তৈল উত্তোলনকারী বেসরকারি সংস্থা ও বিদেশি তৈল সংস্থাগুলির কর্তা ও মন্ত্রীরাও উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী জানতে চেয়েছেন ভারতের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাস ও তেল উত্তোলনের সম্ভাবনা এখন কোন পর্যায়ে এবং কতটা বাড়ানো সম্ভব। বৈঠকে ওএনজিসি, ইণ্ডিয়ান অয়েল, হিন্দুস্তান পেট্রলিয়াম, অয়েল ইন্ডিয়া, ভারত পেট্রলিয়াম কর্তাদের পাশাপাশি ছিল অর্গানাইজেশেন অব দ্য পেট্রলিয়াম এক্সপোর্টিং কান্ট্রিজ (ওপেক), সৌদি আরবের পেট্রলিয়াম মন্ত্রক, রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ, বেদান্ত গোষ্ঠী। ছিলেন অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি ও পেট্রলিয়াম মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। নীতি আয়োগে আয়োজিত এই বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী সবথেকে বেশি জোর দিয়েছেন উৎপাদক রাষ্ট্র ও ক্রেতা রাষ্ট্রের মধ্যে একটি পার্টনারশিপ গঠনে। তিনি বৈঠকে বলেন, আন্তর্জাতিক পেট্রলিয়াম উৎপাদনের পরিমাণ, গুণমান ও মূল্য সবই শুধুমাত্র উৎপাদক রাষ্ট্রই নির্ধারণ করবে এই ব্যবস্থার বদল হওয়া উচিত। সামগ্রিক সমন্বয় না হলে পেট্রল ডিজেল নিয়ে অনিশ্চয়তার আবহ চলতেই থাকবে। পাঁচ রাজ্যের আসন্ন বিধানসভা ভোট এবং তারপর লোকসভা নির্বাচনের আগে যেভাবে পেট্রপণ্যের দাম আকাশ ছুঁয়েছে এবং তার জেরে চরম মূল্যবৃদ্ধির সঙ্কেত দেখা দিচ্ছে তা নিয়ে ঘোর চিন্তায় মোদি সরকার। তাই একটা কিছু ব্যবস্থা গ্রহণে মরিয়া হয়েছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী। কারণ পেট্রপণ্যই অন্যতম ইস্যু হচ্ছে এবারের ভোটের প্রচারে।

