গ্রামনগরঃ শহর ও দূর মফস্বলের কবিদের কাব্য প্রচেষ্টার সমন্বয়

~লিটন রাকিব

রফিক উল ইসলাম সম্পাদিত ‘গ্রামনগর’ কবিতাপত্র

বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত ‘কবিতা’ পত্রিকার মাধ্যমেই আধুনিক বাংলা কবিতা প্রতিষ্ঠা অর্জন করেছিল। ‘কবিতা’, ‘শতভিষা’, কৃত্তিবাসের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে প্রকাশিত বাংলাভাষায় অসংখ্য ছোট বড় পত্রিকা যাদের অনেকগুলি লিটলম্যাগের ধর্মানুসারর কালের নিয়মে বিলুপ্ত হয়েছে। এদের মধ্যেই রয়েছে আধুনিক বাংলা কবিতার ইতিহাসে বেশকিছু স্মরণযোগ্য কবিতা পত্রিকা। পুর্বাশা (১৯৩২), নিরুপ্ত (১৯৪০), একক (১৯৪১), ধ্রুপদী (১৯৬০), শ্রুতি (১৯৬৫)
পত্রিকার পাশাপাশি ছিল দৈনিক কবিতা (১৯৬৬)
সাপ্তাহিক কবিতা (১৯৬৬) বা মাসিক বাংলা কবিতার মত কবিতা পত্রিকা। এমনকী ঘন্টায় ঘন্টায় প্রকাশিত ‘কবিতা ঘন্টীকী’ বেলা ১০টা থেকে শুরু করে বিকাল ৫ টা অবধি পরপর প্রকাশিত হয়েছিল ‘কবিতা ঘন্টীকীর’ আটটি পর্ব। মাত্র একদিন আয়ুষ্কালের এই কবিতা পত্রিকাটি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

গ্রামনগরঃ কবিতা ও কবিতা বিষয়ক পত্রিকা
দক্ষিন ২৪ পরগণার ডায়মন্ড হারবার থেকে শুধুমাত্র কবিতাকে কেন্দ্র করে ১৪ বছর ধরে চলা এই পত্রিকা শহর ও দূর মফস্বলে কবিদের মুখপত্র হয়ে উঠতে পেরেছিল। এই পত্রিকার সময়কাল ১৯৮৫ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত মোট ২০টি সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল। গ্রামে গঞ্জে থাকা কবিকে সাহিত্য চর্চার পাদপ্রদীপের নীচে নিয়ে আসাই ছিল এর মূল উদ্দেশ্য। এই পত্রিকাটি ছিল তৎকালীন সময়ে নতুন আর পুরাতনের মেলবন্ধনের যথার্থ আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। গ্রামনগর শুধুমাত্র কলকাতা কেন্দ্রীক ধ্বনি নয়; কলকাতার বাইরের স্পন্দনও। আর্থিক অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র কবিতাকে ভালোবেসে আধুনিক কবিতার সোনার ফসল ফলিয়েছে গ্রামনগর প্রকাশনী। আলোক সরকার, সামসুল হক, সুব্রত রুদ্রের পাশাপাশি নবাগত সুধীর দত্ত, অরুণ পাঠকের বইও প্রকাশ করেছে।
গ্রামনগরেরর অন্যতম কীর্তি নিঃসন্দেহে সুধীর দত্তকে বাংলা কবিতায় প্রতিষ্ঠা দান। স্বনামধন্য চিত্রী, পরিচালক কবি ও প্রাবন্ধিক পূর্ণেন্দু পত্রী স্বয়ং গ্রামনগর সম্পাদক রফিক উল ইসলামকে ১২/০২/১৯৯৬ সালে একটি চিঠিতে তার বই গ্রামনগর থেকে বের করার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এবং সেইমত সম্পাদকের হাতে ‘ধুলোর মুকুট’ এর পান্ডুলিপি তুলে দেন। ইতিমধ্যেই আলোক সরকার, সামসুল হক, সুব্রত রুদ্রের পাশাপাশি তপন ত্রিপাঠী, অরুণ পাঠক, দীপক হালদার, মনোজ কুমার বাইন প্রমুখের কাব্য প্রকাশ করে রামনগর স্বমহিমায় উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

পত্রিকা প্রকাশ ও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পাশাপাশি গ্রামনগর ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিবছর ২৫ বৈশাখ ভোরবেলা “এসো এসো এসো হে বৈশাখ” প্রকাশ করতে থাকে। এখানে রবীন্দ্রনাথকে নিবেদিত একটি লেখাও থাকত না। আসলে গ্রামনগরের পরিচালকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজেদের লেখা কবিতা, প্রবন্ধ দিয়েই কবিকে শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করবেন।

“এসো এসো এসো হে বৈশাখ” এর ২০০০ সাল পর্যন্ত মোট ৮টি সংখ্যা প্রকাশ পেয়েছিল। গ্রামনগর এরপর “বইমেলার কবিতা” বলে একটি কবিতার ফোল্ডারও বের করেছিল। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে এটির একটি মাত্র সংখ্যা বের হয়েই বন্ধ হয়ে যায়।

গগ্রামনগর পত্রিকা প্রকাশ ও গ্রামনগর প্রকাশনী থেকে বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে যেমন চলত “এসো এসো এসো হে বৈশাখ” প্রকাশ, ঠিক তেমনি ভাবেই প্রতি মাসে পূর্ব নির্ধারিত দিনে চলত কবিতা আসর – “কবিতার সঙ্গে কিছুক্ষণ”। এই আসরে একজন বা সর্বাধিক দুইজন কবি ২০/২৫ টি করে কবিতা পাঠ করতেন। এবং বেশ কয়েকজন কবি মিলে ঐ কবির কবিতা বিশ্লেষণ করতেন। দীর্ঘ এক দশক ধরে চলেছে এই কবিতার আসর। এখানেই কবিতা পড়েছিলেন উত্তম দাস, পার্থজিৎ চন্দ, সুবোধ সরকার, সুধীর দত্ত প্রমুখেরা।
“এসো এসো এসো হে বৈশাখ”, “বইমেলার কবিতা”, “কবিতার সঙ্গে কিছুক্ষণ” এসবই ছিল গ্রামনগরেরই কবি আত্মা।

রফিক উল ইসলামকে পূর্ণেন্দু পত্রীর লেখা চিঠি

গ্রামনগর আধুনিক কবি ও শিল্পীদের একটি মুখপত্র হয়ে ওঠে। তার প্রমাণ তার লেখক তালিকা।
সুভাষ মুখোপাধ্যায়, শুদ্ধসত্ব বসু, রমানন্দ বন্দোপাধ্যায়, মানিক চক্রবর্তী, দেবদাস আচার্য, সামসুল হক, শামসুর রাহমান, অরুণা হালদার, শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, আবুল বাসার, আব্দুস শুকুর খান, অলোক রঞ্জন দাশগুপ্ত কে নেই গ্রামনগরের লেখক তালিকায়! থিওডোর রুথকের কবিতা এবং ফার্ণান্ডো পিসোয়ার কবিতা সর্ব প্রথম কোন বাংলা পত্রিকায় অনূদিত হওয়ার গৌরব অর্জন করে গ্রামনগর। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবঙ্গের কবিদের সাথে সাথেই বাংলাদেশের কবিদের কবিতা প্রকাশ করে গ্রামনগর সেতুবন্ধনের কাজ করে। ক্রমেই গ্রামনগর হয়ে ওঠে যথার্থই শহর ও দূর মফস্বলের কবিদের কাব্য প্রচেষ্টার সমন্বয়।