বিবর্তন বা অভিব্যক্তি তত্ব : আদি প্রবক্তা এক মুসলিম বিজ্ঞানী

চৌধুরী আতিকুর রহমান

চিত্রটি মধ্যযুগের জনৈক আরব প্রত্নজীববিদ দ্বারা উপস্থাপিত একটি জীবাশ্মের ছবি যা দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় এটি একটি সরিসৃপ বা ডায়নোসরের জীবাশ্ম। এই চিত্রটিকে আরব বৈজ্ঞানিক দ্বারা বিবর্তন সংক্রান্ত সামগ্রিক সূত্রায়নের একটি দশা বলে ধরা যেতে পারে। জীবাশ্ম প্রমাণকে বর্তমানে বিবর্তনের অন্যতম প্রমাণ হিসাবে ধরা হয়।

সেই প্রত্নজীববিদ হলেন আজ জাহিয (৭৭৬-৮৬৮), যাঁর জন্মস্থান – বসরা, মৃত্যু – বসরা, সম্পূর্ণ নাম – আবূ উসমান আমর ইবন বাকর আল কিনানি আল ফুকয়ামি আল বাসরি।

তিনি  কিতাব আল হায়ওয়ান (প্রাণীবিজ্ঞান) বইতে প্রাণীজগত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। মোট 7 টি খন্ডে লিখিত বইটিতে স্থান পেয়েছে জৈব বিবর্তন, অভিযোজন, বাস্তুতন্ত্র, দূষণ, খাদ্যাভ্যাস, পশুদের মানসিকতা ও নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা, আলোর প্রতি পতঙ্গের ব্যবহার ইত্যাদি। আমরা এখানে আলোচনা করব বিবর্তন সম্বন্ধে তাঁর মতটি কৈ ছিল সেই বিষয়ে। তাঁর বিবর্তন ব্যাখ্যায় স্থান পেয়েছে বহু উৎপাদন (Prodigality Of Production), বাঁচার লড়াই (আন্ত ও অন্তঃ প্রজাতি (Struggle for Existance – Intra & Inter Spc.), প্রাকৃতিক নির্বাচন (Natural Selection), নতুন প্রজাতির উদ্ভব (Origin of Species) এবং ব্যবহার ও অব্যবহার নীতি (Use & disuse)।

● তাঁর লেখা বই থেকে কযেকটি উদাহরণ দিই :
১) ‘আমরা নিশ্চিত যে আল্লাহ প্রকৃতিকে সৃষ্টি করেছেন বহু উৎপাদনের উপর নির্ভর করে। তারপর অনুপাত স্থির রাখার জন্যে একটি নিয়ম করেছেন জৈবিক বাঁচার লড়াইয়ের মাধ্যমে। অন্যথায় প্রকৃতিতে অসমাঞ্জস্য তৈরি হবে এবং তার সম্পদ ও প্রজাতি হারাবে।’
আমরা এই লেখাটিকে অনায়াসে বহু উৎপাদন (Prodigality Of Production) এবং বাঁচার লড়াই (আন্ত ও অন্তঃ প্রজাতি (Struggle for Existance-Intra & Inter Spc.)-এর উদাহরণ হিসাবে নিতে পারি।

২) আজ জাহিয আরও বলেছেন..
‘ইঁদুর বার হয় খাদ্য সংগ্রহের জন্যে, খোঁজ করে ও আহরণ করে। সে অন্য কিছু নিম্ন পর্যায়ের প্রাণীও খায়, যেমন ছোট প্রাণী ও ছোট পাখি.. এবং নিজেকে ও তার বাচ্চাগুলিকে সাপের এবং পাখির আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্যে গোপণ ভূমিগত সুড়ঙ্গে লুকিয়ে রাখে। সাপের প্রিয় খাদ্য ইঁদুর। সাপ নিজেকে বাঁচাতে চায় বিভার ও হায়নার বিপদ থেকে, যারা তার থেকেও শক্তিমান। হায়না শেয়ালকে ভয় পাওয়ায় এবং শেয়াল তার থেকে নিম্নস্তরের সমস্ত প্রাণীকে ভয় পাওয়ায়… নিয়ম হল কিছু জীব অন্য জীবের খাদ্য.. সমস্ত ক্ষুদ্র প্রাণী তার থেকে ক্ষুদ্রতরদের খায়.. কিন্তু বড় প্রাণী তার থেকে বড় প্রাণীদের খেতে পারে না (আন্ত প্রজাতি লড়াই), মানুষ পরস্পরের প্রতিও প্রায় একই ব্যবহার করে (অন্তঃপ্রজাতি লড়াই)।আল্লাহ এক প্রাণীর বিনিময়ে অন্য প্রাণীকে বাঁচান’ (বাঁচার লড়াই)। এ ছাড়াও বাস্তুতন্ত্রের খাদ্যশৃঙ্খলের উদাহরণও এটি ।

৩) আজ-জাহিয আরও বলেছেন..
‘জনসাধারণ আল মিসখ্ (শ্বাপদ Canine-কুকুর, শেয়াল নেকড়ে ইত্যাদি গোত্রের সম্ভবত অবলুপ্ত একটি প্রাণীর নাম)-এর বেঁচে থাকার ব্যাপারে বহু কথা বলেন। কেউ কেউ এর বিবর্তনের কথা মেনে নিয়েছেন এবং বলেছেন, এর থেকে কুকুর, নেকড়ে, শেয়াল ও সমআকৃতি সম্পন্ন প্রাণীর উদ্ভব হয়েছে। এই শ্রেণির প্রাণীদের সাধারণ পূর্বপুরুষই হল আল মিসখ্’

আমার মনে হয় জৈব বিবর্তনের এবং একইসঙ্গে শ্রেণিবিন্যাস করণের (Classification-taxonomy) এত ভালো উদাহরণ আর হতে পারে না। তিনি আধুনিক বিজ্ঞানীদের মতো জানতেন যে, আল মিসখ্, কুকুর, নেকড়ে, শেয়াল সবই এক গোত্রের (শ্বাপদ canine)। বাঘ, সিংহ মাংসাশী হলেও বিড়াল গোত্রের (cat)।

4) তিনি আরও বলেছিলেন,
‘আল্লাহর ইচ্ছা ও ক্ষমতা এই ধরনের রূপান্তরের মূল কারণ। রূপান্তরের জন্যে খাদ্য, বাসস্থান, জলবায়ু, অন্যান্য প্রভাবক ও সর্বশক্তিমানের ইচ্ছাই দায়ী। যে সকল জীব বেশি অভিযোজিত হয় তারাই পরবর্তী জনুতে (Generation) জননের মাধ্যমে তাদের অভিযোজিত গুণাবলী সঞ্চালন করে এবং ধীরে ধীরে নতুন প্রজাতির উদ্ভব হয়।’ (বংশগতিবিদ্যা Genetics)

5) ‘পরিবেশে একইভাবে আমরা দেখেছি কিছু মরক্কোবাসীকে যারা আল মাসখ্-এর মতো দেখতে সামান্য পার্থক্য ছাড়া।’

6) ‘নিঃসন্দেহে আমরা দেখেছি কিছু ভৌগলিক কারণে কিছু কিছু নুবীয় নাবিককে বনমানুষের মত দেখতে হয়। এবং সম্ভবত দূষিত বায়ু, জল এবং ধুলো এই মরক্কোবাসীদের চেহারা পরিবর্তন করেছে, যদি এই প্রভাব বেশি বেশি করে চলতে থাকে তবে তাদের লোম, কান, রঙ ও আকৃতি বনমানুষের মতো আরও বাড়তে থাকবে।’

যাঁরা মাধ্যমিক পাঠক্রমের দশম শ্রেণির অভিব্যক্তি অধ্যায়টি পড়েছেন তাঁরা বুঝতে পারবেন আজ-জাহিয অষ্টম শতাব্দিতে যা বলেছেন, একটু এদিক-ওদিক করে প্রায় ১০০০ (এক হাজার) বছর পর ডারউইনও একটু বিশদে বলেছেন প্রায় ওই একই ধরনের কথা।