
চৌধুরী আতিকুর রহমান
রজার বেকন (১২১৪-১২৯৪) জন্মান ইংল্যান্ডের সমারসেটের ইলচেস্টারে। ছিলেন মধ্যযুগীয় ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তি। প্রথমে অক্সফোর্ডে ও পরে প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেন, এবং প্যারিসেই শিক্ষকতা শুরু করেন। ১২৫১ খ্রিস্টাব্দে ইংলযন্ড ফিরে এসে ফ্রান্সিসকান সাধু হন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দিয়ে আলকেমি, আলোকবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক ভুগোল নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি চিকিৎসক ছিলেন, ক্যালেন্ডার সংস্কারেও হাত দেন, লেন্স নিয়ে কাজ করতে করতে দুরবীন তৈরীরও একটি প্রকল্প নেন। তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব ছিল বাষ্পীয় ইঞ্জিন তৈরীর পরিকল্পনা।
তাঁর নামে প্রচলিত বহু আবিষ্কারের বর্তমান গবেষণায় জানা গেছে এর বেশিরভাগটাই আরব বিজ্ঞানীদের কাজের অনুবাদ। ইউরোপীয়দের কাছে এইসকল আবিষ্কার নতুন ও অবাক করার মত হলেও আলোকবিজ্ঞানের প্রতিফলন, প্রতিসরণ, লেন্স দ্বারা বস্তুর আপাত বৃদ্ধি এবং দিকচক্রবালে সূর্য ও চাঁদের আপাত বৃদ্ধি হুবহু দশম শতাব্দীর আরবি বিজ্ঞানী আল হায়সামের (ল্যাটিনে- Al Hazen) অনুবাদ। গোলাকার লেন্সের উপর দৃষ্টিভ্রম, আয়নায় প্রতিবিম্ব গঠনের কারণ, রামধনুর সাতটি রঙ সৃষ্টির কারণ ও তার ব্যাখ্যা, ক্যামেরা অবস্কিউরার মাধ্যমে গ্রহণ পর্যবেক্ষণ এইরূপ নানান পরীক্ষা-নিরীক্ষায় তিনি আল হায়সামের ব্যাপক ব্যবহার করেন। আল হাযসামের দর্শণ সংক্রান্ত শারীরবিজ্ঞান, চোখের শারীরস্থান এবং মস্তিষ্কে তার সংবেদনশীলতা, দূরত্ব, অবস্থান, বস্তুর আকার, সরাসরি দৃষ্টি, প্রতিফলিত রশ্মি ও প্রতিসৃত রশ্মি, আয়না, ও লেন্সের কাজগুলি তিনি হুবহু নকল করেন। আল হায়সাম প্রথম বলেন বস্তু থেকে প্রতিফলিত আলো চোখে এসে পড়লেই আমরা উক্ত বস্তুকে দেখতে পাই। পিথাগোরাসের ভুল তথ্যকে নস্যাৎ করে হায়সাম যে নতুন তথ্য দেন তা সর্বপ্রথম ইউরোপকে জানান বেকন।
চশমা তৈরী ও ওড়ার পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা ইবন ফিরনাসকে মনে করিয়ে দেয়। যদিও বেকন ইবন ফিরনাসের ডানা লাগিযে ওড়ার পদ্ধতি অপেক্ষা বেলুনে ওড়ার বিষয়ে অধিক জোর দেন। আধুনিক গবেষণালব্ধ জ্ঞান থেকে জানা যায় বেকন লিখিত ‘ওপাস মাজুস’-এর পঞ্চম অধ্যায়টি আল হায়সামের সাথে সাথে আল কিন্দির আলোকবিজ্ঞানের কাজের উপরও অনেকখানি ঋণী। রবার্ট গ্রস্টেস্ট সর্বপ্রথম আল কিন্দির কাজের অনুবাদ করেন। বেকন তাঁর ছাত্র হওয়ায় সাহায্য পান। প্রবর্ধক কাঁচের (Magnifying glass- চশমা) উপর বেকনের কাজগুলি আল হায়সাম থেকে নেওয়া এবং আল হায়সাম ঋণী ছিলেন ইবন সাহলের কাজের উপর। বর্ণালী সংক্রান্ত নিউটনের কাজগুলি নিউটনের চারশত বছর আগে বেকন প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি জল ভর্তি কাঁচের গ্লাসে সাদা আলো ফেলে সাতটি রঙ সৃষ্টি করে পুনরায় ভিন্ন একটি গ্লাসে সেই সাতটি রঙকে একত্রিত করে সাদা আলো সৃষ্টি করেন। জাফর আল খাজিন পৃথিবীর কেন্দ্রে তরলের ঘনত্ব বেশি হওযার কারণ সম্বন্ধে অভিকর্ষজ ত্বরণকে দায়ী করেন, তাঁর এই মতকে রাজার বেকন ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত করেন।