নেপালের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাত : কূটনৈতিক ব্যর্থতায় দক্ষিণ এশিয়ায় আরো একা মোদীর ভারত

সাইফুল্লা লস্কর : আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কোনো দেশ করো সত্যিকারের বন্ধু হয় না,সবাই নিজেদের প্রয়োজনে অন্যের সঙ্গে প্রয়োজন অনুপাতে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখে। স্বাধীনতার পর থেকে কয়েকটা ক্ষেত্র ছাড়া প্রায় সফল ভাবে কূটনৈতিক অঙ্গনে নিজের আধিপত্য দেখিয়ে এসেছে ভারত । নেহেরুর যামানার ন্যাম (NAM) আন্দোলনের সময় থেকে ভারতবর্ষ নিজের প্রয়োজনে সঠিক বন্ধু বা শত্রু নির্বাচন করে নিজের কার্য হাসিল করে এসেছে।

বর্তমান বিশ্বে এমন খুব কম দেশ যারা ভারতের থেকে বেশি সাফল্য অর্জন করেছে এই ক্ষেত্রে। ঠান্ডা লড়াইয়ের সময় পুরো বিশ্ব যখন দুটি ব্লকে বিভক্ত হয় গিয়েছিল ভারত কিছু নব্যস্বাধীন দেশকে নিয়ে দুটো ব্লকের সঙ্গেই সমান সম্পর্ক বজায় রাখতে পেরেছিল। ঠান্ডা লড়াই পরবর্তী বিশ্বেও ভারত, রাশিয়া এবং আমেরিকার সঙ্গে সমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছে। ভারত একইসঙ্গে ইসরাইল এবং ইরানের সঙ্গে সমান বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক বজায় রেখেছে, এমনকি চিরপ্রতিদ্বন্দী পাকিস্তানের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক বজায় রেখে নেপাল,ভুটান,বাংলাদেশ,মালদ্বীপ, আফানিস্তানসহ বন্ধু প্রতিম প্রতিবেশী দেশ গুলোকে সঙ্গে নিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় নিজের আধিপত্য কায়েম রাখতে সক্ষম হয়েছিল তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেই কূটনৈতিক অঙ্গনে ভারতকে বার বার ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে।

পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক তো ইতিহাসের সব থেকে খারাপ পর্যায়ে এবং এটিই বর্তমানে মোদীর রাজনৈতিক হাতিয়ার। কূটনীতি এবং রাজনীতি গুলিয়ে ফেলায় বারে বারে মোদীর ভারতকে মাশুল দিতে হয়েছে গত ৬ বছরে। অতি আগ্রাসী মনোভাবের কারণে বহুদিনের মিত্র শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশ ভারতের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে শক্রদেশ চীনের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছে। অন্যদিকে নেপালের সঙ্গে কয়েকবছর থেকে ভারতের সম্পর্ক তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নেপাল বারে বারে ভারত সরকার ও তার অন্যান্য সমর্থক উগ্র ধর্মীয় সংগঠন গুলোকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে নেপাল একটা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র সুতরাং ভারত তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলালে সেটা তারা বরদাস্ত করবেনা। নেপালের সংবিধানে ধর্মিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্তির সময়ে ভারতের ধর্মীও সংগঠনের নেতারা তীব্র বিরোধিতা করে যা দেশটির সরকার ভালো ভাবে নেয়নি, নেপাল গত কয়েক বছরে ভারত তাদের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে চাপ সৃষ্টির করছে বলেও অভিযোগ করছে। ভারত নেপাল সংঘাতের নবতম সংযোজন হলো সাম্প্রতিক কালাপানি সংঘাত।

ভারত নিজের সীমান্তে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সেনাবাহিনীর জন্য রাস্তা ও পরিকাঠামো নির্মাণ করছে ২০১৫-১৬ সাল থেকে। চিন ভারত ও নেপাল ত্রিদেশীয় সিমান্তের কাছে উত্তরাখণ্ড থেকে লিপুলেখ পাসের সঙ্গে  সংযোগকারী একটা রাস্তা নির্মাণ করছে যার ব্যাপারে নেপাল আপত্তি তুলেছে। কারণ তাদের মতে ১৮১৬ সালের সাগাউলি চুক্তি অনুসারে ওই অঞ্চল নেপালের অংশ তাই তারা সেখানে তাদের আর্মড পুলিশ ফোর্স মোতায়ন করেছে যা দুইদেশের মধ্যে উত্তেজনার সঞ্চার করেছে এবং নেপালের রাষ্ট্রপতি বিদ্যা দেবী ভান্ডারী নেপালের সংসদে বলেছেন বিতর্কিত লিম্পাধূরা, লীপুলেখ এবং কালাপানি এই তিন অঞ্চলকে অন্তর্ভুক্ত করে তারা নতুন মানচিত্র প্রকাশ করবে। যদিও ভারতীয় সেনা প্রধান মনোজ নারাভানে বলেছেন নেপাল অন্য কারোর হয়ে কথা বলছে। তবে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়টি হলো নেপাল করো জন্য বলুক বা নিজের জন্য বলুক ভারত যে এক গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে হারালো তাও আবার চীনের মতো দক্ষিণ এশিয়ায় প্রভাব বিস্তার উন্মুখ দেশের কাছে তা সাউথ ব্লকে কর্তাদের চিন্তার কারণ হবে টা বলাইবাহুল্য।

বহুদিন থেকে বাংলদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক টানাপোড়েনের স্বীকার। সেদেশের জনগন মনে করে ভারত তাদের থেকে প্রয়োজন মত সব কিছুই নেয় কিন্তু প্রতিদানে কিছুই দেয়না বরং সীমান্তে বিএসএফের হাতে বারে বারে প্রাণ দিতে হয় অনেক নিরীহ বাংলাদেশির। যদিও তাদের সরকার ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে চায় কিন্তু বাংলদেশে বুদ্ধিজীবীদের একাংশ মনে করে হাসিনা সরকারের পিছনে জনগণের সমর্থন নেই তাই তার সরকার ভারতকে পাশে পেতে ভারতের সব অন্যায় আবদার মিটিয়ে চলে। আবার চিন বাংলাদেশেও প্রায় ২৪ বিলিয়ান ডলার বিনিয়োগ করেছে যা দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্ময়নে সাহায্য করবে এবং ভারতের মাথাব্যাথার কারণ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। প্রায় একই অবস্থা শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও তারা এখন ভারতের থেকে চীনের বড়ো বন্ধু এমনকি তাদের হাম্বানটোটা বন্দর চীনের কাছে ৫০ বছরের জন্য বন্ধক দিয়েছে। অন্যদিকে আফগানিস্থানে তালিবান ও আমেরিকার শান্তি চুক্তির পর আশরাফ ঘানি সরকারের অবস্থা এখন টালমাটাল এবং পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ তালিবান ক্ষমতাশালী হচ্ছে যার ফলে আফগানিস্থানে ভারতের বহু কোটি ডলারের পরিকাঠামো নির্মান প্রকল্পগুলির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় মোদীর ব্যর্থ কূটনীতির ফলে ভারত নিজের মিত্র দেশগুলোকে হারিয়ে চলেছে ফলে সার্ক সংগঠনের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে তা বলাইবাহুল্য এবং এই অঞ্চলে ভারতের স্বার্থ অনেকক্ষেত্রে বিঘ্নিত হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশেষ করে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে ভারতকে এখন অনেক বেগ পেতে হবে তা এক প্রকার নিশ্চিত অন্য দিকে পাকিস্তান এই সুযোগে চীনের সাথে এই অঞ্চলে নিজেদের অবস্থান অনেকটাই মুজবুত করে নেবে।