~তায়েদুল ইসলাম

করোনা নামক অনুজীব বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থাকে ন্যাংটো করে দিল। প্রকাশ হয়ে গেল পুঁজিবাদ ভিত্তিক বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার সমস্ত দুর্বলতাকে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমস্ত গর্ব নিয়েই বিশ্ব অনুজীবের সামনে করজোড়ে নতজানু। অর্থ ব্যবস্থা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ার জোগাড়। সভ্যতার মূল কারীগর শ্রমজীবী মানুষের রোজগার বন্ধ । যে কোন সময় দুর্ভিক্ষের বিশ্বায়ন ঘটে যেতে পারে। পরিস্থিতির ভয়াবহতা উপলব্ধি করে ভবিষ্যতের দুঃস্বপ্নে কোটি কোটি মানুষ মানসিক অবসাদে ভুগতে শুরু করেছেন।
এই জটিল ও কঠিন পরিস্থিতিতে বিশ্বনেতারা মানুষকে বাঁচানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন। কিন্তু তাদের গৃহীত কর্মসূচিই মানুষকে আরও বেশি বিপদগ্ৰস্ত করে দিয়েছে। ঘরবন্দি কর্মসূচি সাধারণ মানুষের কাছে মরার উপর খাঁড়ার ঘা।
এই অবস্থায় দুটি প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সামনে এসেছে। এই করোনার মহামারি কি মানুষের তৈরি বা কর্মের ফল। আমরা মনে করি এটা আমাদেরই কর্মের ফল। এখনো পর্যন্ত সমস্ত রকমের আলোচনায় এই মহামারির কারণ হিসেবে যা বলা হচ্ছে তা মূলত চার ধরনের। একটি ভাবনা হল মানুষ পাপে নিমজ্জিত হয়ে গেছে। বিশ্ব স্রষ্টা এই সীমাতিরিক্ত পাপের শাস্তি স্বরুপ এই গজব দিচ্ছে। এই অভিমত অনুযায়ী এই করোনা মহামারি মানুষের নিজ হাতে অর্জন। কারণ পাপ মানুষই করে। দ্বিতীয় মত হল অপরিকল্পিত নগরায়ন, অপ্রয়োজনীয় উন্নতি বিশ্ব পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করেছে। প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ( ইকোসিস্টেম) ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। তার ফলে অনুজীবেরা তাদের প্রাকৃতিক আস্তানা ছেড়ে মানুষের দেহকে আস্তানা হিসেবে পছন্দ করছে। এই পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী এই করোনার থাবা আমাদেরই অর্জন। তৃতীয় ব্যাখ্যা হচ্ছে কথিত উন্নত দেশগুলি স্বল্প উন্নত দেশগুলোতে শোষণ ও লুন্ঠন করার জন্য যে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, প্রাকৃতিক সম্পদ ধ্বংস করেছে, অর্থনৈতিক অবরোধ করে মানবিক বিপর্যয় ঘটিয়েছে । তার প্রতিশোধ হিসেবে এই প্রাকৃতিক আক্রমণ। চতুর্থ প্রচার হচ্ছে হয় আমেরিকা ,না হয় চীন করোনার ভাইরাস নিজেদের পরীক্ষাগারে তৈরি করেছে এবং সেখান থেকে অসাবধানতাবশত ছড়িয়ে পড়েছে। আবার একে অপরের উপর দোষারোপও করছে যে, ইচ্ছা করেই ছড়িয়ে দিয়েছে । যে ভাবেই দেখিনা কেন এই বিপর্যয় আমাদের কর্মের দ্বারা অর্জিত। যদি সবগুলো কারণ কে এক সাথে দায়ী করি তাহলেও এটা আমাদেরই ডেকে আনা বিপর্যয়। আমরা মনে করি সব কারণগুলোই সঠিক। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র। নিজেদের কাজের,ক্ষমতার পরিসর ও পরিমাণ মত। সব চেয়ে বেশি দায়ী রাজনৈতিক দল ও নেতারা। বিশেষ করে কথিত প্রথম বিশ্বের নেতারা। কারণ মানুষের জীবন, সমাজ ও রাষ্ট্র শেষ বিচারে নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতিই। এমনকি ধর্মের ব্যাখ্যা এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আবিস্কার এবং প্রয়োগও নিয়ন্ত্রণ করে রাজনীতি। ফলে আজকে বিশ্ব ব্যবস্থায় যা কিছু ভালো আছে তার কৃতিত্ব যেমন রাজনৈতিক নেতাদের , তেমনি যাবতীয় ধ্বংসাত্বক কার্যকলাপের অপকৃতিত্বও রাজনৈতিক নেতাদের।
অপর গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হল নেতারা হঠাৎ করে মানুষকে করোনা থেকে বাঁচানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন কেন ? প্রশ্ন এই জন্য উঠছে করোনা ছাড়া আরোও অনেক নিয়মিত অসুখে প্রতিমুহূর্তে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারাচ্ছেন । যেমন অনাহার, অপুষ্টি ,যক্ষা ইত্যাদি। তার মধ্যে অনাহার এবং অপুষ্টি দেশ পরিচালনাকারী নেতা,মন্ত্রী, উচ্চপদস্থ আমলা, শিল্পপতিদের পরিকল্পিত সৃষ্টি। এমনকি অনেক সময় কোটি কোটি টন খাদ্য দ্রব্য সমুদ্রে ফেলে দেয় কৃত্রিম দারিদ্র্যকে টিকিয়ে রাখার জন্য। বাকি অসুখগুলোর তো রোগী চিহ্নিত আছেন। চিকিৎসা জানা আছে। ঔষধ মজুদ আছে। তার পরেও তাদের বিনা চিকিৎসায় মরতে হচ্ছে। অন্য দিকে রোগ হতে পারে, চিকিৎসা জানা নেই। ঔষধও নেই। এদের জন্য এত যুদ্ধ। তা হলে স্বাভাবিক কারণেই প্রশ্ন আসছে যাদের পরিকল্পিত নীতি ও কর্মসূচির ফলে অনাহার অপুষ্টি সহ অনেক অসুখ তৈরি হচ্ছে , চিকিৎসা থাকা সত্ত্বেও মানুষ মরছে, যারা কখনো গরীবদের কল্যাণের জন্য কোন কাজ করেনি, যারা এত দিন মানুষকে মারার জন্য তৎপর থাকত আজকে তাদের হঠাৎ কী হল তারা মানুষকে বাঁচানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। আসলে তারা ছটপট করছে নিজেদের বাঁচানোর জন্য। পার্শ্বক্রিয়া হিসাবে সাধারণ মানুষ বেঁচে যাচ্ছেন। ঘটনা হল অনাহার অপুষ্টি সহ বিভিন্ন অসুখে কেবলমাত্র গরীব মানুষরাই মরেন। নেতা মন্ত্রী বিত্তশালীরা মরে না। কিন্তু করোনাতে যে কেউ মরতে পারে। নেতা মন্ত্রী শিল্পপতি বলে কাউকে ছাড়বে না। নেতা মন্ত্রী বিত্তশালীরা যদি এটা নিশ্চিত করতে পারত যে, সেনাবাহিনী, পুলিশ, সিবিআই,এনআইএ প্রভৃতি দ্বারা করোনাকে আটকিয়ে রাখতে পারবে করোনা যেন তাদের আক্রমণ না করে তা হলে তারা করোনার বিরুদ্ধে লড়াই এ নামত না।
বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার ভিত্তি পূঁজিবাদ। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কয়েকটি ফের পুঁজিবাদ এর কোলে। কয়েকটি এখনও টিকে আছে। মৌলিক খুব বেশি পার্থক্য নেই। যেমন সবারই অর্থ ব্যবস্থা সুদ ভিত্তিক। সবাই অস্ত্র প্রতিযোগিতায় বিশ্বাসী। আত্মিক ও সামাজিক ভাবে সব দেশের জনগণই রাষ্ট্রের গোলাম। পূঁজিবাদী রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটি নিরঙ্কুশ ব্যক্তি মালিকানা, অনুৎপাদনশীল ক্ষেত্রে বেশি বেশি পূঁজি নিয়োগ, পূঁজির মালিকদের অপচয় ও বিলাসিতা। ফলে সম্পদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বন্টন, বৈষম্য। এর হাত ধরে তৈরি হবে ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অপুষ্টি। এ ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে পূঁজিবাদী বড় রাষ্ট্রগুলি ছোট রাষ্ট্রগুলির উপর শোষণ চালায়,সম্পদ লুট করে। নানা কলাকৌশল এর পরে সামরিক আক্রমণ করতে অজুহাতের অভাব হয় না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে মানুষের কল্যাণে ব্যবহার করার চেয়ে মানুষকে ধ্বংসের কাজে বেশি ব্যবহার করা হয়। টেকসই উন্নয়নের পরিবর্তে চোখ ধাঁধানো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোটি কোটি মানুষকে ভুখা রেখে অল্প মানুষের আকাশচুম্বী উন্নয়ন করা হয়। নগর কেন্দ্রিক উন্নয়ন করতে গিয়ে জঙ্গল , নদী, পাহাড় উজাড় করে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দেয়া হয়। আজকের বিশ্ব এ সবেরই বাস্তব চিত্র। সমস্তটাই পুঁজিবাদ ভিত্তিক ব্যবস্থার অনিবার্য ফসল।
এত দিন পুঁজিবাদ ভিত্তিক ব্যবস্থার কুফল সম্পর্কে সাধারণ মানুষ শিক্ষিত ও সচেতন ছিলেন না। শুধুমাত্র কিছু সমাজতান্ত্রিক ও ইসলামিক নেতা কর্মীদের একাংশ শিক্ষিত ও সচেতন ছিলেন এবং আছেন। কিন্তু তাঁরা পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে মানবতাবাদী সমাজ নির্মাণের উপযুক্ত সংগঠন ও আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেননি। করোনার আক্রমণ তাদের সামনে সুযোগ করে দিয়েছে বিশ্ববাসীর সামনে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কুফলকে তুলে ধরার। শ্রমজীবী মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করার। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করার। পুঁজিবাদী ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখে তার মধ্যে থেকে বর্তমান প্রধান প্রধান সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অর্থনৈতিক শোষণের মূল কারণ সুদ ভিত্তিক অর্থনীতি এবং নিরঙ্কুশ ব্যক্তি মালিকানা। সম্পদের অসামঞ্জস্যপূর্ণ বন্টনকে বজায় রেখে দারিদ্র্য বিমোচন করা যায় না। বর্তমান পুঁজিবাদী ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রক কর্পোরেট জগৎ বা বহুজাতিক বানিজ্য কোম্পানিগুলো করোনার আক্রমণকে ব্যবহার করছে নিজেদের পুঁজির সংকটকে কাটিয়ে শোষণকে আরও পাকাপোক্ত করতে। তারই অংশ বিশ্বজুড়ে লকডাউন কর্মসূচি। সামগ্ৰিক উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বন্ধ করে কৃত্রিম অভাব তৈরি করে সব জিনিসপত্রের দাম বৃদ্ধি করতে চাইছে। পাশাপাশি কৃত্রিম অভাব তৈরি করে শ্রমিকদের সস্তায় শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য করার পরিস্থিতি তৈরি করছে। লকডাউনের পিছনের এই রাজনীতিকে আমাদের সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। লকডাউন চলাকালীন সময়ে আমাদের দেশের শ্রমিকদের প্রতি সরকারের আচরণ খেয়াল করলেই বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে।