
চৌধুরী আতিকুর রহমান
ক্রেমোনার জেরার্ড (১১১৪-১১৮৭)
জন্মগ্রহণ করেন উত্তর ইটালির লম্বার্ডিতে দেহত্যাগ করেন স্পেনের টলেডোতে যা প্রায় ১০০ বছর আগে মুসলিম শাসন থেকে পাকাপাকি স্পেনীয় খ্রিস্টান শাসনে আসে। তাঁর টলেডো পাড়ি দেওযার মূল উদ্দেশ্যই ছিল দর্শনের শিক্ষকের উপর অনাস্থা, আরবি শেখা এবং ওই ভাষাতেই টলেমির আল মাজেস্ট পড়ে তা ল্যাটিনে অনুবাদ করা। কাজটি শেষ করেন ১১৭৫ নাগাদ। ১১৪৪-এর পূর্বেই ক্যাস্টিল পৌঁছান। আলফোনসো VI-এর সময় টলেডোর ইহুদি মহল্লার প্রধান রাব্বি ইব্রাহিম ইবন এজরা এবং মুসলিম আলেমগণ তাঁকে সাহায্য করেন। তখনও মো্জারবিক সংস্কৃতি (স্পেনীয় খ্রিস্টানদের দ্বারা গৃহীত আরবি সংস্কৃতি) প্রবল ছিল।
ইউক্লিডের Elements-এর আল ফারগানি কৃত আরবি অনুবাদটির সর্বোত্তম ল্যাটিন অনুবাদটি জেরার্ডের কীর্তি। তিনি সরাসরি সাবিত ইবন কোর্রার আরবি অনুবাদ থেকেও গ্রহণ করেন এবং উভয় মিলিত অনুবাদ কার্যটি ইউরোপে পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। তাঁর নামের সঙ্গে প্রায় ৮৭-টি অনুবাদ কার্য যুক্ত রয়েছে। তিনি প্রকৃতপক্ষে ভালো আরবি জানতেন এবং একটি অনুবাদ দলের প্রধান ছিলেন। আলমাজেস্ট ছাড়াও আ্যরিস্টটল, ইউক্লিড ও গ্যালেনের গ্রিক কাজগুলির আরবি বিজ্ঞানীদ্রের মৌলিক কাজ সহ আরবি থেকে ল্যাটিনে অনুবাদ করেন। আল খোয়ারিজমির ‘আল জবর আল মুকাবলা’ বইয়ের আল জবর অংশ থেকেই বীজগণিতের জন্যে আ্যলজ্যাবরা নামটি নেওয়া হয়। খোয়ারিজমির কৃতিত্বের ভাগিদার ছিলেন জেরার্ডও; কারণ তিনিই এই বইটির অনুবাদ করার সময় আ্যলজ্যাবরা নামটি প্রথম ব্যবহার করেন বলে বিদগ্ধজন মনে করেন। তাঁর কাজের পরিধি গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞান ছাড়াও চিকিৎসাবিদ্যা, আলকেমি ও ভাগ্য গণনার মত অপবিজ্ঞানের সঙ্গেও যুক্ত ছিল। জাকারিয়া আর রাজির ‘আল মনসোর’ ও অন্যান্য আরবদের আলকেমি জ্ঞান জেরার্ডের কাছে এতদূর গ্রহণযোগ্য ছিল যে ভেনিস ও প্যারিস থেকে প্রাপ্ত পান্ডুলিপি আকারে গ্রিক আলকেমি জ্ঞানও তাঁর অনুবাদের বিষয় হয়নি। আল ফারাবির ‘আল ইহসা আল উলুম’ নামক বইটির আলোচ্য বিষয় ছিল প্রাণীজগতের শ্রেণিবিভাগ, ধর্ম ইত্যাদি; জেরার্ড De Scientiis নামে এর অনুবাদ করেন। এ ছাড়াও হুনায়ন ইবন ঈষাক, আল কিন্দি (আলোক বিজ্ঞান), বনু মুসা, জাবির ইবন আফলাহ (Elementa astronimica), আল হায়সাম (কিতাব আল মানাযির), আল ফারগানি (On Elements of Astronomy on the Celestial Motion), ইত্যাদি আরব জ্ঞান সাধকদের কার্যাবলীরও অনুবাদ করেন, ১১৮৭-র পূর্বে জাবির ইবন হায়য়ান-এর ‘কিতাব আস সাবেইন’ বইটিও ল্যাটিনে অনুদিত হয়. 1) Salah Zaimeche (2003). Aspects of the Islamic Influence on Science and Learning in the Christian West, p. 10. Foundation for Science Technology and Civilisation.
বিজ্ঞান চর্চা এবং এইরকম অনুবাদ কার্যে তিনি এমনভাবে যুক্ত ছিলেন যে কোনদিনই আর দেশে ফিরে যাতে পারেননি। এই ধরনের মানুষগুলির আত্মত্যাগের ফলেই বিজ্ঞান ও মানবসভ্যতা আজ এত সমৃদ্ধ।