প্রাচ্য থেকে পাশ্চাত্য- আরব বিজ্ঞান ভাবনার পাশ্চাত্য গমণ – ১

~চৌধুরী আতিকুর রহমান

ভূমিকায় আরব পঞ্জিকা বা ‘আল মানাক’ যার প্রকৃত নাম নাম হল কিতাব আল আনওয়া। ৯৭১ খ্রিস্টাব্দে উমাইয়া আল হাকাম শাসিত কর্ডোবা নগরীর খ্রিস্টান বিশপ হারিব ইবন জায়েদ বইটির ল্যাটিন অনুবাদ করেন। অনুবাদটি আল হাকাম আল মুস্তানসিরবিল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয়। আরবি নাম আল মানাক ইউরোপে প্রচারিত হল তেমনই আরবি পদ্ধতিতে একই সঙ্গে চান্দ্র মাস ও সৌর মাস একত্রে রেখে পঞ্জিকাটি ইউরোপে প্রচলিত হয়। সম্ভবত এটিই আরবি থেকে ল্যাটিনে অনুদিত প্রথম বিজ্ঞান সংক্রান্ত বই।

পঞ্জিকার যা কাজ, সন্তান জন্মের শুভসময় থেকে চাষ শুরু করার সময় নির্ণয় এবং কারও মৃত্যু হলে সময়টি শুভ কিনা এইরূপ জন্ম থেকে মৃত্যু সব কিছু জানার জন্যে ইউরোপীয়রা কয়েক শতক ধরে আরবদের অধিত জ্ঞানের উপর নির্ভরশীল ছিল এবং এই জ্ঞানভান্ডারে প্রবেশদ্বার ছিল এই অনুবাদকার্যটি।

জন এফ গ্যারিসনের মতে টনিক হিসাবে আবিষ্কার করতে গিয়ে তা গলানোর জন্যে জাবির ইবন হায়য়ান ও জাকারিয়া আররাজি দ্বারা অ্যাকুয়া রিজিয়ার মত শক্তিশালী নাইট্রিক ও হাইড্রোক্লোরিক অ্যাসিডের মিশ্রণ আবিষ্কৃত হয়। চির যৌবন লাভের জন্যে এলিক্সির আবিষ্কার করতে করতে গিয়ে আবিষ্কৃত হয় বিভিন্ন অজৈব উৎস থেকে সৃষ্ট রাসায়নিক ঔষধ।

পরবর্তীতে স্পেনীয় দ্বীপ ম্যাজরকার রেমন্ড লালি (১২৩৫-১৩১২) ভালো ভাবে আরবি শিখে উত্তর আফ্রিকার আরবিভাষীদের নিকট যান যিশুর বাণী শোনাতে। ফিরে এলেন আরবি আলকেমির জ্ঞান নিয়ে। তিনি বেশ কিছু আলকেমি জ্ঞান ইউরোপে এসে মন্টপিলিয়রে প্রয়োগ করেন, তরল সোনা বা ‘অওরাম পটাবাইল’ আবিষ্কার করেন এলিক্সির হিসাবে সেবনের জন্যে। এইরকম ছিলেন ভিল্লানোভার আরনল্ড, তিনি আলকেমির গবেষণায় জীবন অতিবাহিত করেন। মনে করা হয় তিনিই টিংচার ও ব্রান্ডির ইউরোপে প্রচলন করেন।

মঠকেন্দ্রিক জীবনে রোমক সংখ্যাতত্ত্ব ব্যবহার করে গণনাকার্য সম্পন্ন করাকেই যথেষ্ট বলে মনে করা হত। পাটিগণিতের প্রধান ব্যবহার ছিল ঈস্টারের প্রকৃত তারিখ নির্ণয়ের জন্যে সঠিক পদ্ধতি নির্ণয় করা-হিসাবটির ভিত্তি ছিল ১৯ টি সৌর বছর এবং ২৮ টি সৌর চক্রের মধ্যে কয়টি চান্দ্রচক্র পড়ে (মোট ২৩৫ টি চান্দ্র পরিক্রমণ) তার গণনার মধ্যে। ৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে বেডের সময় পদ্ধতিটি বেশ পরিণত হয়ে গেছে এবং ১৫০০ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ হিসাবটি নামতার মত শ্লোক আকারে বার বার পড়া হত। ১২ শতক নাগাদ রোমক জরিপকারীদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে ক্ষেত্রফল ও আযতন নির্ণয়কারী মোটামুটি সূত্রগুলির সাথেই জ্যামিতির অধিকাংশই যুক্ত ছিল। কিছুক্ষেত্রে উপরোক্ত চিন্তাধারার অন্যথাও থাকতে পারে। কিন্তু প্রাচ্য জ্ঞানের ইউরোপ গমণ সম্বন্ধে নারায়ণ চন্দ্র চন্দ্র মহাশয় তাঁর বই ‘চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাস’-এর ১০৪ পাতায় লিখেছেন, ‘ইউরোপীয় রেনেশাঁ পর্বে নতুন করে প্রকৃত গ্রিক লেখাগুলির খোঁজ পড়ে’-তাঁর মতে (যদিও নেতিবাচক, তবুও পাশ্চাত্যের ঋণ গ্রহণের কথা স্বীকার করে নিয়েছেন), ‘এই খোঁজ পড়ার কারণগুলির মধ্যে একটি হল প্রাচীন জ্ঞান-বিজ্ঞান এতদিন আরবি ভাষার মাধ্যমে যথাযথভাবে রূপান্তরিত ও প্রতিফলিত হয়নি’।

লেখাগুলিতে আমরা পাবো মধ্যযুগের প্রাথমিক পর্বে ইউরোপীয় কুপমন্ডুকতা এই পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল যে পদে পদে তাদের গ্রিক বিজ্ঞানের আরবি অনুবাদ এবং আরবদের মৌলিক কাজগুলির দ্বারস্থ হতে হয়েছিল।