~লিটন রাকিব

শুনতে অবাক লাগলেও সম্পূর্ণভাবে সমুদ্রের উপর নির্ভরশীল ‘বাজাউ’ উপজাতির আজও পুরো জীবন কাটে সমুদ্রে। জলের নীচে ডুবে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতা রয়েছে এদের। মূলত মালয় সমুদ্রে বাস বাজাউদের। প্রশান্ত ও ভারত মহাসাগরের মাঝে অবস্থিত ব্রুনেই, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়াকে ঘিরে বেশ কয়েকটি উপসাগর রয়েছে। সুলু, সেলেবিস, বান্দা, মালুকু, জাভা, ফ্লোরেস এবং সাঙু – এইসব উপসাগরগুলির নীল জলে ঘুরে বেড়ায় বাজাউরা, তাঁদের বিশেষ আকৃতির নৌকা লেপালেপাতে চড়ে। নির্দিষ্ট কোন ঠিকানা নেই এদের তাই এদের বলা হয় ‘Sea Nomads’ / সমুদ্র যাযাবর। বাজাউদের কোন দেশ নেই। পরিচয়পত্র নেই। অসুস্থ হলেও তটভূমি ছোঁয়ার উপায় নেই। নাগরিক না হওয়ায় কোন দেশ তাঁদের চিকিৎসাও করে না বরং পুলিশ গ্রেফতার করে রাখে। তাই জন্মের মত বাজাউদের মৃত্যুও হয় সমুদ্রে। মরুভূমির যাযাবরদের কথা তো অনেকেই জানেন কিন্তু সমুদ্র যাযাবর বা সমুদ্র-জিপসিরা সেভাবে প্রচারে আসেনি তাই হয়তো বর্তমান প্রজন্ম এবিষয়ে অজ্ঞাত। মূলত এরা ইসলাম ধর্মালম্বী।
সমুদ্রের অগভীর এলাকায়, তীর থেকে আধ কিলোমিটার সমুদ্রের ভেতরে বাজাউরা তৈরি করে তাঁদের অস্থায়ী গ্রাম। বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি করা বাড়িগুলি প্রয়োজনে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে খুলে ফেলা যায়। ছোট ছোট ডিঙির মত নৌকা করে চলে এ বাড়ি থেকে সে বাড়ি যাওয়া আসা। বাড়ি থেকে নেমে মাটিতে কোনদিনও পা রাখেনি। রাখবেই বা কী করে? নিজের দেশ নেই, দেখলেই পুলিশ তাড়া করে। বাজাউরা নিজেদের বয়স বলতে পারেনা এ যুগেও, সময় – তারিখ সম্পর্কে তাঁদের ধারণা নেই। অত্যন্ত শান্ত ও আমুদে এই উপজাতিটি সম্পূর্ণ সামুদ্রিক খাবারের উপর বেঁচে থাকে বছরের বেশিরভাগ দিনই তাঁদের সমুদ্রের নীচে নামতে হয়। জলের নীচে তারা জলের উপরের মতোই সাবলীল। ছোট বাজাউ শিশুরাও সমুদ্রের তলায় অক্লেশে মাছের মতোই সাঁতার দিয়ে বেড়ায়। অবিশ্বাস্যভাবে এরা জলের নীচে শ্বাস ধরে রাখতে পারে ১৩ মিনিট।

প্রায় হাজার বছর আগে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জোহর রাজ্যের রাজকন্যা আয়েশা দায়াংকে পাহারা দিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বাজাউরা। মূলত বাজাউদের উপর নিরাপত্তার দায়ীত্ব থাকলেও অতর্কিত আক্রমণে তারা রাজকন্যাকে রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়। ফলে দেশে ফিরলে জোহরের রাজা তাঁদের হত্যা করবেন। প্রাণের ভয়ে কয়েকশ বাজাউ আর দেশে ফিরতে পারেনি। স্থলের সঙ্গে তাঁদের চিরকালের জন্য বিচ্ছেদ হয়ে যায়। সমুদ্রই হয়ে যায় তাঁদের ঘর। ঘুরতে থাকে বাজাউরা বিভিন্ন উপসাগরে, দেশহীন যাযাবর হয়ে। আমাদের দেশের জারোরাদের মতোই ওরাও আশ্রয় নেয় প্রকৃতির কোলে একবিংশ শতাব্দীতেও তারা সমস্ত ধরণের সুযোগ সুবিধা থেকে আজও বঞ্চিত।
ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার দুই গবেষক মেলিসা ইলাডো ও রাসমুস নিয়েলসেন জানিয়েছেন – বাজাউদের জিনে থাকা কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্যই তাদের প্রাকৃতিক ডুবুরি করেছে। বাজাউরা যখন শ্বাস চেপে জলে ডুব দেয় তখন তাদের দেহে বিভিন্ন পরিবর্তন দেখা দেয়। হৃদপিণ্ড তার কাজ কমিয়ে দেয় অক্সিজেন বাঁচিয়ে রাখার জন্য। পাল্স রেট নেমে দাঁড়ায় প্রতি মিনিটে মাত্র ৩০ বার। মানুষের প্লীহা হল অক্সিজেন যুক্ত লোহিত রক্ত কণিকার ভাঁড়ার ঘর। ডুবন্ত বাজাউদের প্লীহা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে এই আপতকালীন পরিস্থিতিতে রক্তের স্রোতে অক্সিজেন যুক্ত লোহিত রক্ত কণিকার যোগান বাড়িয়ে দেয়। মেলিনা ইলাডো বাজাউদের DNA পরীক্ষা ও তাদের প্লীহার আল্ট্রাসোনোগ্রাফি করান। একই সঙ্গে তিনি বাজাউদের সঙ্গে অতীতে সম্পর্কযুক্ত ও বর্তমানে আমাদের মতোই স্থলে বাসকরা মোরো উপজাতির বেশকিছু মানুষকেও একই পরীক্ষা করান। উভয় গোষ্ঠীর সমস্ত পরীক্ষা করে দেখা যায় বাজাউদের প্লীহা মোরো উপজাতির মানুষদের প্লীহার তুলনায় ৫০ শতাংশ বড় আর এই শারীরিক পার্থক্যই বাজাউদের অবিশ্বাস্য ডুবুরি করে তুলেছে।
সব মিলিয়ে বলা যায় যে, সামুদ্রিক পরিবেশে টিকে থাকার জন্য হাজার হাজার বছর ধরে খাদ্য সংগ্রহের জন্য সমুদ্রের গভীরে যাওয়ার অভ্যাস বাজাউদের বিভিন্ন অঙ্গ ও শ্বসনতন্ত্র এবং রক্ত সংবহন তন্ত্র স্থায়ী পরিবর্তন ঘটিয়েছে। তাই বুঝি বাজাউরা সমুদ্রের জলে মাছের মতোই স্বচ্ছন্দ সাবলীল। এদের প্রধান খাদ্য বিভিন্ন মাছ। স্টিং রে, স্কুইড, অক্টোপাস। জন্মের মত বাজাউদের মৃত্যুও হয় সমুদ্রে। নৌকা করে দূর সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে ভাসিয়ে দেওয়া হয় মৃতদেহ। সমুদ্রের পুত্র কন্যারা সমুদ্রগর্ভেই বিলীন হয়ে যায় সামুদ্রিক জীবের খাদ্য হতে হতে।
উৎসঃ Cell Journal