নির্যাতন নয় চাই শিশুর আরো বেশি নিরাপত্তা’

নির্যাতন নয় চাই শিশুর আরো বেশি নিরাপত্তা’

~লিটন রাকিব

শিশু নির্যাতন হল শিশুদের শারীরিক, মানসিক বা আবেগজনিত ভাবে নিগ্রহ করা। শিশুরা সুন্দরের প্রতীক, পবিত্রতার প্রতিমূর্তি, নিসর্গ আনন্দের উৎস হওয়া সত্ত্বেও দিনে দিনে সমাজে নৈতিক অবক্ষয়ের কারণে শিশু নির্যাতন ক্রমেই বেড়েই চলেছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এক সমীক্ষা অনুযায়ী ভারতের পরিবার, স্কুল ও অনাথ আশ্রমগুলিতে শিশুদের উপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগ জাগানোর মতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের অর্ধেকেরও বেশি শিশু যৌন নিগ্রহের শিকার।
একজন প্রাপ্ত বয়স্ক ব্যক্তি তার যৌন আকাংখা চরিতার্থ করতে শিশুটিকে ব্যবহার করে। শিশুটিকে জোর করে অঙ্গপ্রদর্শনে বাধ্য করে তাকে পর্ণগ্রাফি দেখায় তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। শিশুর যৌন নিগ্রহ নানাভাবে হয়ে থাকে।

  • সেক্সুয়াল অ্যাসাল্টঃ এখানে শিশুকে সরাসরি শারীরিক নিগ্রহ করা হয় যেমন- রেপ বা সেক্সুয়াল পেনিট্রেশান।
  • সেক্সুয়াল মলিস্ট্রেশনঃ অর্থাৎ যৌন উৎপীড়ন এক্ষেত্রে শরীরের গোপন অঙ্গ স্পর্শ করা অথবা অন্য কারও শারীরিক সম্পর্ক প্রদর্শন করা।
  • সেক্সুয়াল এক্সপোলিয়েশনঃ এখানে শিশুটিকে ব্যবহার করা হয় নিজেদের প্রয়োজনে অনেক ক্ষেত্রে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে অশালীনভাবে ব্যবহার করা হয় যেমন পর্ণগ্রাফী বানানো বা জোর করে দেহব্যবসায় নামানো।
  • সেক্সুয়াল গ্রুমিংঃ যৌন বিষয়ে জোর করে শিক্ষিত করে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে পণ্য করে তোলা।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যে সত্যটি সামনে এসেছে, শিশুর যৌন নিগ্রহে কোন পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় বা পরিচিতরা যুক্ত থাকে। এক্ষেত্রে দৈহিক বল প্রয়োগ করে, শাসিয়ে কাজটি করা হয় তাই এইসব ঘটনা পুলিশের কাছে পৌছায়না, হয়না কোন মামলা। যাদের মানসিক বিকৃতি থাকে বা অনেক প্রতিপত্তিশালী ধ্বনী ব্যক্তি নিছক ব্যক্তিগত শখে এটা করে থাকে আসলে যাদের কাছে পেট চালানোটাই একটা সমস্যার বিষয়, তাদের কাছে জীবনের আরসব সমস্যা গৌণ হয়ে যায় কিন্তু যাদের কাছে পেট চালানোটা কোন সমস্যার বিষয়ই নয়, তাদের সমস্যা তলপেট থেকে কয়েক ইঞ্চি নিচে নেমে যায়।

শহরের দুই আভিজাত স্কুলের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। এম পি বিড়লা স্কুলে সাড়ে তিনবছরের একশিশুকে দিনের পর দিন যৌন নির্যাতন করা হত এক্ষেত্রে অভিযুক্ত দুই নরপশু স্কুলেরই কর্মী। যদিও শিশুটি ইঙ্গিতে তা বোঝানোর চেষ্টা করেছিল কিন্তু মা-বাবা বুঝতে পারেননি। অবশেষে রক্তক্ষরণ হতে দেখে শিশুটির মা’র বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে তার মেয়ের সাথে কি ভয়াবহ ঘটনা ঘটেছে। এখন আমার প্রশ্ন শিশুদের হাত, পা, চোখ এর মত কেন যৌনাঙ্গ / লিঙ্গ চেনানো হয় না। যদি চেনানো হত হয়তবা শিশুটি সঠিকভাবে বোঝাতে সক্ষম হত। তাই ছোটবেলা থেকেই ছবি এঁকে গল্পের ছলে শরীরের অন্যসব অঙ্গের মতো যৌনাঙ্গও চিনিয়ে দিতে হবে। সাথে সাথে Bad Touch / Good Touch ( ভালো স্পর্শ / খারাপ স্পর্শ ) শেখাতে হবে।

শিশুরা সারাদিনের অনেকটা সময় স্কুলে কাটায়। ফলে শিক্ষক বা শিক্ষিকাদের সঙ্গে তাদের অনেকটা সময় কাটাতে হয়। তাই প্রত্যেক শিক্ষকের কাজ হচ্ছে শিশুদের মধ্যে নিজেদের রক্ষা করা বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং তাদের পিতামাতা ও কেয়ারগিভারকে এবিষয়ে শিক্ষাদান করা। তারা শুধু একজন শিক্ষক হিসাবে কাজ করবেন না, তারা সমাজ পরিবর্তনের ধারক ও বাহক হিসাবেও কাজ করবেন।

Journal of child abuse and neglect- এ বলা হয়েছে যে, ‘শিশু নির্যাতন হচ্ছে গুরুতর শারীরিক অথবা মানসিক নির্যাতন যা থেকে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। সেকারণেই চাই শিশুর পবিত্রতা রক্ষার নিরাপত্তা, তাদের বিকশিত হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ।

এখন তো তিন-চার বছরের আগেই শৈশব শেষ হয়ে যাচ্ছে। মুছে যাচ্ছে তাদের একান্ত নিজস্ব কল্পনার আকাশ, চাপিয়ে দিচ্ছি পিঠের উপর ভারী বোঝা, হারিয়ে যাচ্ছে খেলার মাঠ আর সীমাহীন আনন্দের আবহ।। এসব নিয়ে এবার ভাবার সময় এসেছে, ভাবতেই হবে তাই আসুন ভাবি বার অন্তত। এজন্য আগাম সতর্কতার দায়িত্ব নিতে হবে অভিভাবকদের এবং স্কুল কতৃপক্ষকে যাতে শিশুকে তাদের প্রাপ্য শৈশবটুকু ফিরিয়ে দিতে পারি।

লেখকঃ লিটন রাকিব বিশিষ্ট কবি এবং বর্তমানে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে গবেষণারত স্কলার। লেখকের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন লেখকের নামের উপরে ক্লিক করে অথবা সরাসরি ফোন করতে পারেন ৯৪৩৩৫ ০৬৬৬৪।