মোহাম্মদ সাদউদ্দিন

কলকাতার পার্কসার্কাস এলাকার পার্কসার্কাস ময়দান এলাকায় সোহরাওয়ার্দি এভিনিঊয়ে বাংলাদেশ উপহাইকমিশন লাইব্রেরি ও তথ্য কেন্দ্র। ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে যারা গবেষণা করেন, কিংবা যারা ইতিহাসের ছাত্র তাদের কাছে এই লাইব্রেরির একটি আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। আবার যারা ভিসা করবেন বাংলাদেশ যাওয়ার জন্য, ভিসা সংক্রান্ত – ব্যাপারে এখানে কলকাতা ও বাইরের লোকজন ভিড় করেন। উত্তর ২৪ পরগণার শ্যামনগর থেকে এসেছিলেন সাতকড়ি মুখোপাধ্যায়। আদি পিতৃনিবাস বাংলাদেশের মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর গ্রাম। বাংলাদেশ উপহাইকমিশন লাইব্রেরিতে এসে বাংলাদেশ যেতে গেলে ভিসা কীভাবে করতে হবে খুঁটিনাটি সবই ভারপ্রাপ্ত লাইব্রেরিয়ানের কাছ থেকে সাতকড়ি বাবু জানলেন। কিছুক্ষণ পর সাতকড়ি বাবুর চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগলো। আমরা যারা সেই সময় লাইব্রেরিতে ছিলাম জানতে চাইলাম ৮৯ বছরের সাত কড়ি বাবুর কাছে, ‘আপনি কাঁদছেন কেন?’ জবাবে সাতকড়ি বাবু জানালেন, ‘মাকে ছেড়ে চলে এসেছি। ভিটে-মাটি ছেড়ে চলে এসেছি, আবার এই বৃদ্ধ বয়সে মাকে দেখতে যাব। দুঃখ আর আনন্দ মিলিয়ে চোখে জল আসছে।’ হয়তো বিষয়টি অনেকে অনেক ভাবে নিতে পারে। অনেকে বিষয়টি তামাসা হিসাবে নিতে পারে। বিষয়টি কি এতই সহজ? ভিটে-মাটি ছাড়ার তো একটা বেদনা আছে।
এবার আরও একটি ছবির বর্ণনা দিলে বিষয়টি স্পষ্ট হবে। বাংলাদেশের ঢাকায় মহম্মদপুরের তাজমহল রোডে থাকেন আব্দুর রকিব। প্রকৃত নিবাস মুর্শিদাবাদের সালার থানার রাইগ্রাম। কলকাতার তালতলার দেদারবক্স লেনে একটি বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করতেন রকিব সাহেব। আমার দিদিমার (নানি) চাচাইতো ভাই তিনি। ৫২-৫৩ সালে কলকাতার ও আশ-পাশ এলাকায় দাঙ্গা হওয়ায় তিনি রাতা-রাতি তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তান চলে যান যশোহর রোড পার হয়ে। বছর ছয়-সাতেক আগে আমি নিজেই বাংলাদেশ যায়। রকিব নানার বাড়িতে পৌঁছায়। তারপর তার নিজের ঘরে কাঁদতে কাঁদতে বলেই ফেললেন, বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের জন্মভূমি ছেড়ে চলে আসি। কিন্তু আজ শুধু মনে হয় মরার পর যদি আমাকে মুর্শিদাবাদের সেই গ্রামে শেষ জায়গাটি করে দেন, এর চেয়ে আর গৌরবের আর কী হতে পারে?
হ্যাঁ প্রত্যেকের কাছে তার জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও সুন্দর। সাতকড়ি বাবু ও আর আব্দুর রকিব সাহেবের মনের আক্ষেপটি একই, আর তা হল শিকড়চ্যুত হয়ে জীবনের অন্তিম দিনটি যদি আবার সেই শিকড়ে গিয়ে মিলে যেতে পারা যায়। দুজনের আক্ষেপ-আফশোষ কিংবা শিকড় ছাড়ার মর্মবেদনা থেকে এই সিদ্ধান্তে আসা যায় যে, দেশভাগের পর কেবলমাত্র পূর্ব-পাকিস্তান বা বাংলাদেশ থেকে বাঙালি হিন্দুরা পশ্চিমবাংলায় বা ভারতে আসেনি। পশ্চিমবঙ্গ, অসম বা আগরতলা থেকে প্রচুর লোক তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্থানে বা অধুনা বাংলাদেশে যান। যশোহর রোড বলুন, পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলির দেশত্যাগ করার ট্র্যাজেডি শুধু এক পক্ষের নয়, উভয়পক্ষের। দেশ ভাগ হলে পাকিস্তানের অমুসলিমরা ভাবল তাদের এদেশে থাকার কোনও অধিকার নেই, পাশাপাশি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলির মুসলিমরা ভাবল তাদের ভারতে থাকার অধিকার নেই। ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে ষড়যন্ত্রকারী জাতীয় নেতারাই কিন্তু এটা ভাবিয়ে দিয়েছে। অবিভক্ত ভারতের আমজনতা দেশ-ভাগ চাননি। দেশভাগ করেছে গদির নেশায় মশগুল দেশের ‘মীরজাফর-জগতশেঠ’ মার্কা কিছু নেতা। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগ হওয়ার পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে দাঙ্গা লাগিয়ে পরিস্থিতি এতই আতঙ্কিত করে তোলে যে, মুসলিমরা যশোহর রোড পার হয়ে যেমন পূর্ব পাকিস্থান চলে যান, তেমনি বাঙালি হিন্দুরাও ঘটি-বাটি ছেড়ে পশ্চিমবাংলায় চলে আসেন। এক কথায় ‘Root was not one way, But two ways’। স্থানান্তরটা শুধু এক পক্ষের নয়। উভয় পক্ষের। কিন্তু দেশ ভাগের পর পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার চলচ্চিত্র, সাহিত্য বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এখনকার লেখক সাহিত্যিকরা যে ভাবে ভিটে-মাটি ছাড়ার ইতিহাস নির্মাণ করছেন, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি মুসলিম সন্তানরা প্রতিষ্ঠিত হলেও সেভাবে কাজ করেনি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘পূর্ব-পশ্চিম’, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে’, প্রফুল্ল রায়ের ‘কেয়া পাতার নৌকা’, মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায়ের (শঙ্কর নামেই পরিচিতি বেশি)। ‘এপার বাংলা-ওপার বাংলা’, বইগুলিতে শিকড় ছিন্ন হওয়ার ট্র্যাজিক ছবি অঙ্কিত হয়েছে। কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্যে পূর্বপাকিস্তান (অধুনা বাংলাদেশ) থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষের শিকড় ছেঁড়ার ও শিকড় ছাড়ার ট্র্যাজিক গল্প স্থান পেয়েছে। সেগুলি নিয়ে সিনেমা বা টিভি সিরিয়ালও হয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে বঙ্গ সন্তানরা, একটু স্পষ্ট করে বললে বলা যায় বাঙালি মুসলিম সান্তানরা ঢাকায় গিয়ে তারা প্রতিষ্ঠা পেলেন তারা কিন্তু সেভাবে শিকড়চ্যুত হওয়াদের নিয়ে সেভাবে কোনও গল্প, উপন্যাস, বা সাহিত্য তৈরি করতে পারেননি, ঢাকায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে যে সব বাঙালি মুসলিম চলে গেছেন তাদের নিয়ে কোনও সাহিত্য বা সিনেমা করেননি। বাঙালি মুসলিমদের সঙ্গে বাঙালি হিন্দুদের তফাৎটা ঠিক এখানেই। ব্যতিক্রম একটু হাসান আজিজুল হক। যদিও তার ‘আগুন পাখি’ দেশভাগকে নিয়ে লেখা হলেও সেটা আহামরি কিছু নয়। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রফুল্ল রায়, মনিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় যেমন অধুনা বাংলাদেশের ভূমিপুত্র, তেমনি হাসান আজিজুল হক, হায়াত মামুদ (প্রকৃত নাম মুহম্মদ মনিরুজ্জামান), শওকত ওসমান, বসির-আল-হেলাল (প্রকৃত নাম নেয়ামুল বসির); বদরুদ্দিন উমর, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সেখ দরবার-এ-আলম, এরাও তো জন্মসুত্রে পশ্চিমবঙ্গের ভূমিপুত্র। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতের কিংবদন্তী অভিনেতা ‘নায়করাজ’ রাজ্জাক তো কলকাতারই ভূমিপুত্র। ‘৬৪’ সালের দাঙ্গার শিকার হয়ে কলকাতা ছাড়েন। ‘৬৪’-এর দাঙ্গায় বিশাল সংখ্যক বাঙালি মুসলমান তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে পালিয়ে যায়। বিশেষ করে কলকাতা ও কলকাতা সংলগ্ন হাওড়া, হুগলী, দুই ২৪ পরগণার বাঙালি মুসলিমদের বড় অংশ তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান চলে যায়। সে কথা আমরা কি মনে রাখি? কলকাতা শহরের বাঘাযতীন, যাদবপুর, সোনারপুর-কামালগাছি, সুলেখা, সন্তোষপুর, টালিগঞ্জ, বাঁশদ্রোনী, বিজয়গড়, আজাদ্গড়, প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড, কসবা, হালতু, ভবানীপুর, এলাকার বাঙালি মুসলিমরা আজ কোথায়? আবার মধ্য কলকাতা ও উত্তর কলকাতার মানিকতলা, বেলেঘাটা, উল্টোডাঙা, বাগুইআটি, ভিআইপি রোড, শ্যামবাজার, যশোহর রোড, দমদম, নাগেরবাজার, মধ্যমগ্রাম, বারাসাত, কাজিপাড়া, গুমা, হাবড়া, অশোকনগর প্রভৃতি এলাকার বাঙালি মুসলিমরা কাতারে কাতারে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তানে পাড়ি দেন। ভারত ভাগের ঘোর বিরোধী কলকাতার মেয়র (৯৪৩-৪৪) ও সাংসদ বদরুজ্জোজাও তার ছেলে-মেয়েদের আটকে রাখতে পারেননি। তাই দেশ ভাগ শুধু পূর্ববাংলা থেকে আসেনি, পশ্চিমবঙ্গ থেকেও বিশাল সংখ্যক মানুষ ওপারে চলে গেছেন। ট্র্যাজেডি কিন্তু দুই পক্ষেরই। ভিটে-মাটি শুধু এক পক্ষ ছেড়ে আসেননি, দুপক্ষই ছেড়েছেন। তাই যশোহর রোড শুধু এক পক্ষের কাছে ট্যাজেডি নয়, দুপক্ষের কাছেই ট্র্যাজেডি।