পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন প্রমাণ করল কৃষক-শ্রমিক উপেক্ষিত হলে ধর্মীয় সুড়সুড়ি কোনও কাজ করেনা

পাঁচ রাজ্যের নির্বাচন প্রমাণ করল কৃষক-শ্রমিক উপেক্ষিত হলে ধর্মীয় সুড়সুড়ি কোনও কাজ করেনা

~মোহাম্মদ সাদউদ্দিন~

কৃষক-শ্রমিক-খেতমজুর-কৃষিশ্রমিক সংগঠিত-অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিক কিংবা ছাত্র-যুব-মহিলাদের জীবন-জীবিকার স্বার্থ বিঘ্নিত হলে তার বিষময় ফল যে কতখানি হতে পারে ৫ রাজ্যের নির্বাচনের ফল আবার তা প্রমাণ করল। সেক্ষেত্রে ধর্মীয় সুড়সুড়ি বা ধর্মীয় বিভাজন করার যাবতীয় ষড়যন্ত্র যে ব্যর্থ হয় তাও প্রমাণ করে দিয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিসগড়, মিজোরাম এবং তেলেঙ্গানার মানুষ। আর এই ৫ রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল শুধু বিজেপি শাসিত রাজ্যের শাসক দলকে চিন্তায় ফেলেনি, বরং ভীতি সঞ্চার করেছে পশ্চিমবঙ্গের শাসকদলেরও। কেন্দ্রীয় সরকারের শ্রমআইন সংস্কার, কৃষকদের ফসলের লাভজনক দাম না দেওয়া, বছর বছর বেকারত্ব বৃদ্ধি, মহিলা নির্যাতন, উগ্র-হিন্দুত্ববাদ বনাম নরম-হিন্দুত্ববাদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিজেপি ও তৃনমূল যেন ‘মুদ্রার এপিট-ওপিট’। একটি অসম প্রতিযোগিতামূলক সাম্প্রদায়িক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের সুস্থ চেতনার আকাশকে বিসাক্ত করেছে, সে কথা বলাই বাহুল্য। আসানসোল, নৈহাটি হাজীপাড়া, ধুলাগড় কিংবা ক্যানিংয়ের ঘটনা পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহ্যকে নষ্ট করেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিন্তু শ্রমিক-কৃষকরাই।

৫ রাজ্যের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর কিন্তু কংগ্রেস প্রথমেই মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান ও ছত্তিসগড়-এ কৃষিঋণ মকুব করেছে। এটা কংগ্রেসের একটি বাস্তবমুখী সিদ্ধান্ত। ছত্তিসগড় আর মধ্যপ্রদেশে কৃষক-খেতমজুর আন্দোলনের উপর ব্যাপক গুলি চলেছে। তারপর বর্ষীয়ান বামপন্থী সাংসদ ও নেতা হান্নান মোল্লা এবং আরেক কৃষক আন্দোলনের নেতা অতুল আনজানের নেতৃত্বে দেশব্যাপী ২১২ টি ছোট-বড় কৃষক সংগঠন একত্রিত হয়ে কৃষক যাত্রা করেছেন। মহারাষ্ট্রের নাসিক থেকে মুম্বাই পর্যন্ত লাখ লাখ মানুষের মিছিল একটি অন্যতম মাত্রা পায়। সেখানে সমস্ত ধরণের বাম, অতিবাম ও ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি জোটবদ্ধও হয়েছিল। জাতীয় কংগ্রেস এই আন্দোলনকে সর্বোতভাবে সমর্থন করে। তার ফলও হাতেনাতে পেয়েছে কংগ্রেস ও ধর্মনিরপেক্ষ শক্তিগুলি। বিজেপি-র কাছে কাছে এটি একটি চরম আঘাত। এই ৫ রাজ্যের বিধানসভার নির্বাচন প্রমাণ করে দিয়েছে শ্রমিক-কৃষক-ছাত্র-মহিলা সহ সাধারণ মানুষের জীবন জীবিকা বন্ধ করে দিয়ে ধর্মীয় সুড়সুড়ি কোনও কাজ হয়না। আমাদের মনে রাখতে হবে ওইসব রাজ্যগুলিতে মুসলিম ভোটারের সংখ্যা যৎসামান্যই। আর বিজেপি শাসিত রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদের গদি উল্টে দিয়েছে কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই, যারা ধর্ম-সম্প্রদায়ের দিক থেকে হিন্দু। কারণটা নিশ্চয়ই জীবন-জীবিকায় ঘা পড়ার জন্যই।

অনেকে একথা বলবেন যে, পশ্চিমবঙ্গে ৩০ শতাংশ ভোটার ধর্ম-সম্প্রদায়ের দিক থেকে মুসলিম। এখানে বিজেপি আসা যেমন কঠিন, তেমনই তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করাও কঠিন। অঙ্কটা কিন্তু এত সহজ নয়। ৩৪ বছর বামফ্রন্ট ক্ষমতায় ছিল। ৯০-এর দশকে হিন্দুত্ববাদের বা বিজেপি-র রমরমা আমরা দেখেছি। সে সময়ও বিজেপি আরএসএস-এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মুসলিমরা শুধু নয়, সবাই বামফ্রন্টকে ভোট দিয়েছিল। আবার বামফ্রন্ট বিশেষ করে সিপিআই-(এম) কমরেডরা যখনই নীচের স্তরে বাড়াবাড়ি করতে শুরু করল, ২০০৮ -এর পঞ্চায়েত নির্বাচন থেকে পতনের খেলা শুরু হল। আর ২০১১ সালে বামফ্রন্ট শেষপর্যন্ত চলে গেল। আমাদের ইতিহাসটা এত সহজে ভুলে গেলে চলবে না যে, ১৯৭৭ সালে এসমা, নাসা সহ বিভিন্ন কালাকানুন চালু ও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল কংগ্রেসের একাংশ। ৭৭ সালের লোকসভার নির্বাচনে ইন্দিরা-সঞ্জয় সহ কংগ্রেসের ট্র্যাজিক পরাজয় আমরা দেখেছি। আবার সেই ইন্দিরা গান্ধীকে ওভারকাম করতে দেখেছি ১৯৮০ সালেই।

পশ্চিমবঙ্গে তৃনমূল সরকার যতই কৃষক মান্ডির গল্প কাঁদুক না কেন, কৃষক ও কৃষি শ্রমিক এখানেও ঘোর সঙ্কটে। শিল্প নেই, হু হু করে বেকারত্ব বাড়ছে। মহিলারা কোনওনা কোনওভাবে নির্যাতনের শিকার। জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ভাগচাষিরা। আবার সেই জোতদার-জমিদারদের দাপাদাপি, তৃনমূল দলের খেয়োখেয়ি আর অন্তদ্বন্দ-প্রকাশ্যে গোষ্ঠী কোন্দল সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত ও হতহম্ব করে দিচ্ছে।  শুধু যদি দিদি আমাদের ভিত্তি, আর ভাইপো আমাদের ভবিষ্যৎ করার লক্ষ্য হয় তাহলে দলটাই ভেঙ্গে যাবে তাসের ঘরের মতোই। আরও একটা কথা বলা জরুরি যে, আসামের এনআরসি কাণ্ডের প্রভাব এরাজ্যে পড়াই বিজেপি অনেকটাই ব্যাকফুটে। আর এই দলটির ধর্মীয় সুড়সুড়ি সেভাবে কাজ করছে না। আবার সিপিআই-(এম) সহ বাম-অতিবাম শক্তি এবং গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি সাধারণ ধর্মঘট ও ব্রিগেড সমাবেসের জন্য যে সব সভা-সমাবেশ করছে তাতে কিন্তু লোক সমাগম হচ্ছে চোখে পড়ার মত। বিশেষ করে সিঙ্গুর মিছিল-এ এটা লক্ষ্য করা গিয়েছে। মুসলিমরা ভাবছে দিদি কেবল ইন-শা-আল্লাহ, মাশ-আল্লাহ করে চলেছে তাতেই কাজ হয়ে যাবে। কিন্তু তাঁদের চাকুরী কমে যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদের বিরুদ্ধে দিদি হিন্দুত্ববাদকেই অস্ত্র করছেন। তাতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। তাই এবার অন্য পথ নিতে হবে। তাই ৫ রাজ্যের নির্বাচনের ফলাফল-এর ভিত্তিতে পশ্চিমবঙ্গের মা-মাটি-মানুষ যথেষ্ট উদ্বেগে।

মতামত লেখকের অত্যন্ত ব্যক্তিগত