ধর্মনিরপেক্ষতার চর্চাটাও নিষ্ঠার সাথে করিনি।

~তায়েদুল ইসলাম

ধর্মনিরপেক্ষতার ইংরেজী প্রতিশব্দ সেকিউলারিজম (secularism)। ধর্মনিরপেক্ষ বা secular এর ভাবধারা ইউরোপ থেকে ধার করা । উপমহাদেশে এর ব্যবহার নিয়ে প্রথম থেকেই ভিন্ন মত ছিল। সপক্ষদের মনেও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল। সংবিধানে প্রথমে সেকিউলার শব্দটি ছিল না। ১৯৭৬ সালে সংবিধান সংশোধন করে শব্দটি ঢোকানো হয়। ধর্মনিরপেক্ষ বিষয়টির সংজ্ঞা, ব্যাখা-বিশ্লেষণ, চরিত্র নিয়েও মত-পার্থক্য আছে। আমাদের দেশেও রাজনৈতিক দল ও নেতাদের মধ্যেও ঐক্য নেই। এই নিয়ে সর্বোচ্চ আদালতকেও মতামত দিতে হয়েছে। সে যাই হোক, সমস্ত আলোচনার মধ্যে থেকে সাধারণ ভাবে যে জিনিসটি স্পষ্ট হয়েছে তা হল রাষ্ট্রের নিজস্ব কোন ধর্ম থাকবে না। রাষ্ট্র কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করবে না। রাষ্ট্রের চোখে সকল ধর্মই সমান। প্রচলিত অর্থে ধর্ম শব্দটিকে না ধরলে রাষ্ট্র কোন ধর্মের প্রতি আনুকূল্য দেখাবেনা ঠিকই কিন্তু রাষ্ট্রের নিজস্ব ধর্ম থাকবে। সেই কারণে রাষ্ট্র ও ধর্ম নিয়ে আলোচনার সময় প্রচলিত ধর্ম বা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ব্যবহার করাই সুবিধাজনক। এই বিষয়ে অন্য সময় একটু বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা রইল। আমরা এখানে আলোচনা করতে চাইছি ‘রাষ্ট্র কোন ধর্মের প্রতি পক্ষপতিত্ব করবে না’ এই নীতিটিকেও কি আমরা সঠিক ভাবে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছি। এক কথায় ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রের চরিত্র হল রাষ্ট্র তার কোন নাগরিকের ধর্ম-বিশ্বাসে বা ধর্মাচারনে হস্তক্ষেপ করবে না যদি তা রাষ্ট্র ব্যবস্থায় বা পরিচালনায় অথবা অন্য নাগরিকের স্বাভাবিক জীবন-যাপনে সমস্যা তৈরী না করে। পরিবার বা সম্প্রদায়ের ধর্মবিশ্বাস বা ধর্মাচরনেও রাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে না যদি তা অন্য পরিবার, সমাজ বা সম্প্রদায়ের সমস্যা সৃষ্টি না করে। এখানেই প্রশ্ন আসে কেউ কি ধর্মের নামে সন্তান হত্যার দাবী করতে পারে? রাষ্ট্র কি ধর্মের নামে সামাজিক কুসংস্কারকে চলতে দিতে পারে? নাগরিককে তথা সমাজকে কুসংস্কার মুক্ত বা বিজ্ঞানমনস্ক করে গড়ে তোলা কি রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে  পড়ে না? এ সমস্ত বিষয়ও নানা বিতর্ক ডেকে নিয়ে আসবে। তবে একটা সীমারেখা যদি রাষ্ট্র টেনে দেয় কোন বিষয় কুসংস্কার হোক বা বিজ্ঞান বিমুখিনতা হোক তা যদি অন্যান্য নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবন-যাত্রায় সমস্যা সৃষ্টি না করে তা হলে রাষ্ট্র তাতে মাথা ঘামাবে না।


এখন পর্যন্ত যা আলোচনা করলাম তা কি আমরা পালন করার চেষ্টা করেছি? কতকগুলি বিষয় সামনে আনছি। রাষ্ট্র সঠিক ভূমিকা পালন করেছে কিনা তা বিবেচনার ভার পাঠকদের উপর ছাড়লাম। শুক্রবার জুমার নামাজ রাস্তার উপর পড়ার অনুমতি দেওয়া। রাস্তার উপর পূজোর প্যান্ডেল করতে দেওয়া। সরকারি জমি বা রাস্তায় মন্দির তৈরি করতে দেওয়া। সরকারি অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ধর্মীয় আচার মেনে করা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের ক্ষেত্রে সরকারি অর্থ ব্যয় করা। যেমন কবরস্থান, ঈদগাহ ঘেরা, হজে ভরতুকি দেওয়া, মন্দির তৈরিতে অর্থ সাহায্য করা, বিভিন্ন ধর্মীয় মেলা, স্নান প্রভৃতিতে সাহায্য করা। আরো অনেক বিষয় আছে। আমাদের মনে হয় সরকারের উচিৎ এ সব বন্ধ করে সকল নাগরিকের খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষার মত মৌলিক প্রয়োজনগুলি সুনিশ্চিত করা।

 

(লেখক তায়েদুল ইসলাম একজন সমাজসেবী ও শিক্ষাবিদ। সারা জীবন সামাজিক কাজ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে নিজেকে ব্যস্ত রেখেছেন। মানবাধিকার, ন্যায়বিচারের জন্য সারাজীবন লড়াই করে চলেছেন। লেখকের সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ করতে এখানে ক্লিক করুন।)