বাংলার স্মরণীয় মুসলিম

আমার এক বন্ধু আমাকে বলেছিল, আমাদের খুব দুর্ভাগ্য যে, মুসলিম সমাজে কোনও রামমোহন-এর জন্ম হলনা। আমি তাকে সেদিন বলেছিলাম, তোমার ইতিহাসে অল্প-স্বল্প জ্ঞান আছে। রাম মোহনের জন্ম ১৭৭২ খ্রিষ্টাব্দে হুগলী জেলার রাধানগর গ্রামে। তারও জন্মের চল্লিশ বছর আগে হুগলী জেলারই হুগলী শহরে ১৭৩২ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন ‘দানবীর হাজী মোহাম্মদ মহসীন’। তার জন্ম সাল নিয়েও একটু মতোভেদ আছে। কেঊ কঊ বলেন তার জন্ম ১৭৩০ খ্রিষ্টাব্দে। তাদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন পারস্যের লোক। বাবার নাম হাজী ফয়েজ উল্লাহ। মুলত ব্যবসার জন্য তাদের পূর্বপুরুষরা সুদূর পারস্য থেকে ভারতে আসেন। তারপর থেকে যান এদেসে। তার বাবা হাজী ফয়েজ উল্লাহ ছিলেন একজন বড় মাপের ব্যবসায়ী।
হুগলীর বিখ্যাত ওস্তাদ আগা সিরাজীর কাছে বাল্যপাঠ শেষ হওয়ার পর তিনি বাংলা-বিহার-ওড়িশার রাজধানী মুর্শিদাবাদে আসেন। মুর্শিদাবাদ মাদ্রাসায় তিনি ভর্তি হন। আর সেখানে তিনি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি ভ্রমণ বৃত্তান্ত জ্ঞান-বিজ্ঞান নিয়ে বিশেষ শিক্ষা লাভ করেন। মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ করে মুর্শিদাবাদের নবাবের অধীনে চাকুরিও গ্রহণ করেন। তার মন দাসত্ব করার ক্ষেত্রে সায় দেয়নি। অল্প কিছুদিন চাকুরি করার পর ফিরে আসেন হুগলীতেই। আরও বলা দরকার, বাল্য শিক্ষা লাভ করেছিলেন তিনি ওস্তাদ আগা সিরাজীর কাছে। ওই ওস্তাদের কাছে তার দিদি মন্নুজানও বাল্য শিক্ষা লাভ করেন। মন্নুজান মহসীনের চেয়ে ১৪ বছরের বড়। আরবি, ফার্সি ছাড়াও ওস্তাদ সিরাজীর কাছে ভ্রুমন কাহিনী শুনতেন। তার কাছেই মহসীন সঙ্গীতেও তালিম নেন। অস্ত্র চালনা, কুস্তি, অশ্বারোহণ বিদ্যালাভ করেন।
মুর্শিদাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষা শেষ করে চাকুরি পান নবাব দরবারে। কিন্তু তা ছেড়ে দিয়ে চলে আসেন হুগলীতে মন্নুজানের কাছে। উল্লেখ করা যেতে পারে মুর্শিদাবাদ মাদ্রাসায় পড়ার সময় মহসীনের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল নবাব সিরাজের সঙ্গে। এই সিরাজের প্রকৃত নাম ছিল মির্জা মহম্মদ। মহাসীনের ভগ্নিপতি অর্থাৎ মন্নুজানের স্বামী কবি ও রাজনীতিক মির্জা সালাহউদ্দিন মুর্শিদাবাদের নবাব এস্টেটে চাকুরি করতেন। নবাবের দূত হিসাবে মারাঠাদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপনে সালাহউদ্দিন খুবই দক্ষতার পরিচয় দেন। আর তার ফলে নবাব আলীবর্দি খাঁ তার দক্ষতায় সন্তুষ্ট হয়ে কয়েকটি এলাকার জায়গীর প্রদান করেন। মুর্শিদাবাদ থেকে মহসীন তার মাদ্রাসা শিক্ষা শেষ করে পুনরায় হুগলীতে বোন মন্নুজানের কাছে ফিরে এলে তিনি খুব খুশী হন। মন্নুজান তার ভাই মহসীনকে তার বিষয়-আশয় সমস্ত সম্পত্তি দেখ-ভাল করার দায়িত্ব দেন। কিন্তু এই দেখভালের কাজও মহসীন-এর ভাল লাগেনি।

তিনি ভগ্নির সম্পত্তির ভার ভগ্নীপতির হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ১৭৬২ খ্রিষ্টাব্দে বিভিন্ন দেশ ভ্রুমণে বেরিয়ে পড়েন। পায়ে হেটেই মাত্র ৩২ বছর বয়সে সমস্ত বিপদ-আপদ, বাঁধা-বিপত্তিকে কাটিয়ে ভারতবর্ষ, আরব, মিশর, তুরুস্ক, তুর্কীস্থান ভ্রুমণ করলেন। ২৮ বছর কেটে যায় বিভিন্ন দেশে। ভ্রুমণ কালে তিনি হজ পর্বও শেষ করেন। ষাট বছর বয়সে ফিরে এলেন ভারতবর্ষে। সালটি ছিল ১৭৯০ খ্রিষ্টাব্দ। এই ২৮ বছরের ভ্রুমণ জীবনে তিনি মক্কায় নবীজির কবর জিয়ারতও করেন। এত বছর ধরে ভ্রমণ পৃথিবীর খুব কম লোকই করেছেন। আসলে মহসীন এটাই রপ্ত করেছিলেন যে, ভ্রুমনই শিক্ষার অংশ। আরবের মক্কা ও মদিনায় বহুদিন ছিলেন। সেখানে তার সঙ্গে জ্ঞানী-গুণী ও বিভিন্ন আলেম সম্প্রদায়ের মানুষের সংস্পর্শে আসেন। লাভ করেন বিভিন্ন অভিজ্ঞতা। ১৭৮৯ সালে তিনি যখন ফিরে এলেন দেশে, তখন তার বয়স ৬০ বছর।

ফিরে এলেন সংসার ত্যাগী, জ্ঞান-বৃদ্ধ এক ফকিরের ছদ্মবেশে। মহসীনের সুন্দর ও কোমল ব্যবহার, অনাড়ম্বর জীবন ব্যবস্থা, সৎ চরিত্র, জ্ঞান-গর্ভ কথাবার্তা সব সম্প্রদায়ের মানুষকে অভিভূত করে। সব সম্প্রাদায়ের মানুষ তাকে দেখতে আসেন। লখনউ-এর নবাব তার জ্ঞানগর্ভ কথা শুনে তাকে তার দরবারে আমন্ত্রণ জানান। মহসীনের বিচিত্র জ্ঞান ও পান্ডিত্যের কথা শুনে লখনউ-এর নবাব তার দরবারের প্রধান পন্ডিতের পদ গ্রহণ করার অনুরোধ জানালে তিনি তা ত্যাগ করেন। নিজ জন্মভূমি হুগলীতে ফেরার জন্য তিনি ব্যকুল। ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে মহসীন তার প্রিয় জন্মভূমি হুগলীতে ফিরে এলেন। ততদিনে বোন মন্নুজানও বৃদ্ধা হয়ে গেছেন আর মারা গেছেন ভগ্নীপতি সালাহউদ্দিনও। ভাইকে পেয়ে বোন মন্নুজান দারুণ খুশি। বোন মন্নুজান সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির দায়িত্ব মহসীনের হাতেই তুলে দেন। সম্পত্তি দেখা-শোনা, ভ্রমণ বৃত্তান্ত, ধর্মালোচনা, সবধর্ম আলোচনা নিয়ে মহসীনের দিন কাটতে থাকে। হঠাৎ মন্নুজান অসুস্থ হয়ে পড়েন। তিনি সমস্থ সম্পত্তি মহসীনকে লিখে দিলেন। ১৮০৩ সালে মন্নুজান বেগমের জীবনাবসান হল। মহসীনও তার বোনের বিশাল সম্পত্তি পেয়ে সেগুলিও গরিব দীন-দুঃখীকে বিলিয়ে দেন। ১৮০৬ সালে ১ লক্ষ ৫৬ হাজার টাকা দিয়ে তিনি শিক্ষা ফান্ড করেন। ২০৫-২০৬ বছর আগে ওই টাকার পরিমাণ এখন কত? যদিও সেটি আজ ‘মহসীন মেমোরিয়াল ফান্ড’ নামে পরিচিত। হুগলী মহসীন কলেজ ও হাসপাতাল, ইমামবাড়া হাসপাতাল প্রাসাদ মহসীনের অর্থেই প্রতিষ্ঠিত। শিক্ষা ফান্ড ছাড়াও তার বাকী সম্পত্তি দীন-দরিদ্র মানুষের জন্য বিলিয়ে যান। আজকাল কোন ভুঁইফোড় শিল্পপতি বা ব্যবসায়ী কিছু দান করছে, ব্যাস আর যায় কোথা! তাকে তো ‘এযুগের মহসীন’ বানানোর জন্য কিছু ভাড়াটে কলমবাজ বা সম্পাদক উঠেপড়ে লেগেছে। সমাজতাত্বিক, সমাজ-বিজ্ঞানী কিংবা সমাজ গবেষকদের সংস্পর্শে যাওয়ার মাঝে মধ্যে সৌভাগ্য ঘটেছে। তাদের মতে মহসিনের যে বিশাল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি ছিল যা তিনি গণ-মানুষের গণসেবায় বিলিয়ে গেছেন। আজকের দিনে তার আর্থিক মুল্য ভারতের প্রথম শ্রেণী বৃহৎ শিল্পপতিদের চেয়েও বেশি। কয়েক জন শোষক শিল্পপতিকে যখন মহসীনের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তখন মনে হয় ইতিহাসকে মিথ্যায় পরিণত করা হচ্ছে।
১৮১২ সালের ২৫ নভেম্বর এই মহান ত্যাগী, দানবীর, মানব হিতাকাঙ্খি মহসীনের জীবনাসন ঘটে। হুগলী মহসীন কলেজ, হুগলী ইমামবাড়ি, হুগলী মাদ্রাসা, হুগলী ইমামবাড়া হাসপাতাল, ছাড়াও বাংলার বুকে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সবই মহসীনের অর্থানুকূল্যে তৈরি। কলকাতার তালতলা এলাকায় হাজী মহম্মদ মহসীন স্কোয়ার তার নামকে হয়তো ওদিকে গেলে স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্ত একজন দানবীর সর্বত্যাগী, জ্ঞানী, পণ্ডিত-প্রবর সঙ্গীতজ্ঞ মহসীনের মুল্যায়ন কিন্তু সেভাবে হয়নি। মহসীন দান করে গেছেন নীরবে। এখনকার ভুঁইফোড় দান করে সরবে। কোথাও পয়সা দিয়ে কলমবাজ তৈরি করে তার দানের কথা ফলা করেও লেখানো হয়। মনে রাখতে হবে ‘মহাসীন মহাসীনই’। তার সঙ্গে কেউ তুলনায় আসেনা।